চট্টগ্রামে সম্মুখ সারির স্বাস্থ্যকর্মী ও পোশাক শ্রমিকদের দেহে কোভিড-১৯ এন্টিবডি তৈরি বিষয়ক গবেষণার ফলাফল

  • Posted on 29-09-2021 15:20:42
  • National

শরীরে নির্দিষ্ট কোন রোগের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কিনা, সেটি পরীক্ষা করার জন্য শরীরের রক্তের নমুনা নিয়ে অ্যান্টিবডি টেস্ট করা হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে কেউ করোনা ভাইরাস বা অন্য কোন রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন  কিনা, সেটা বুঝতে পারা যায়। কোভিড-১৯ থেকে সুস্থ হওয়ার নির্দিষ্ট সময়ের পর মানব দেহে এন্টিবডি তৈরি হয়, যদিও একেক জনের দেহে একেক রকম হারে এন্টিবডির পরিমাণ পরিবর্তিত হয়। এছাড়া কোভিড-১৯ টিকা নেয়ার মাধ্যমে শরীরে এন্টিবডি তৈরি হয়।  

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) ওয়ান হেলথ ইন্সটিটিউট সম্প্রতি সার্স-কোভ-২ সংক্রমণের বিস্তার নির্ণয়ের জন্য একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে। সিভাসু-এর মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. গৌতম বুদ্ধ দাশ এর নেতৃত্বে এক দল গবেষক কোভিড-১৯ এর এন্টিবডির ব্যাপকতা (প্রিভেলেন্স) ও পরিমাণ নির্ণয়ে গবেষণা পরিচালনা করেন। গবেষক দলে রয়েছেন প্রফেসর ড. শারমিন চৌধুরী (প্রধান গবেষক ও পরিচালক, ওয়ান হেলথ ইন্সটিটিউট), প্রফেসর ডা. এম.এ. হাসান চৌধুরী (সহ-প্রধান গবেষক ও বিভাগীয় প্রধান, মেডিসিন বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ), ডা. জাহান আরা (সহকারী গবেষক), ডা. সিরাজুল ইসলাম (সহকারী গবেষক), ডা. তারেক উল কাদের (সহকারী গবেষক), ডা. আনান দাশ (সহকারী গবেষক), ডা. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম (সহকারী গবেষক), ডা. ইয়াসির হাসিব (সহকারী গবেষক), ডা. তাজরিনা রহমান (সহকারী গবেষক), ইন্টার্ন ডা. সীমান্ত দাশ (সহকারী গবেষক)। গবেষণাটি চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল এর ডাক্তার, নার্স, রোগীর এটেনডেন্ট, আউটডোর ও ইনডোর রোগী (কোভিড-১৯ আক্রান্ত নয় এমন), পরিচ্ছন্নতা কর্মী এবং পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের সার্স-কোভ-২ এর উপসর্গযুক্ত, উপসর্গহীন, প্রথম ডোজ টিকা প্রাপ্ত ও উভয় ডোজ টিকা প্রাপ্ত মোট ৭৪৬ জন ব্যক্তিদের ওপর পরিচালনা করা হয়েছে। এই সমীক্ষার মাধ্যমে সেরোপজিটিভিটি (রক্তে সার্স-কোভ-২ এর এন্টিবডির উপস্থিতি) সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সমীক্ষাটি ২০২১ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিচালনা করা হয়। গবেষণায় এন্টিবডির (IgG) উপস্থিতি ও পরিমাণ Enzyme-Linked Immunosorbent Assay (ELISA) test  এর মাধ্যমে নির্ণয় করা হয়েছে। 

গবেষণায় দেখা যায়, স্বত:স্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণকারী মোট ৭৪৬ জনের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ জনগোষ্ঠী (২২৩ জন) কোভিড-১৯ ভ্যাক্সিনের শুধু মাত্র প্রথম ডোজ নিয়েছেন। উভয় ডোজ নিয়েছেন প্রায় ৩১ শতাংশ (২৩১ জন) এবং ভ্যাকসিন গ্রহণ করেননি জনগোষ্ঠীর ৩৯.১৪ শতাংশ (২৯২জন) 

 

চলমান গবেষণার একটি উল্লেখযোগ্য লক্ষ্য হলো গবেষণায় অংশ গ্রহণকারীদের মধ্যে সার্স কোভ-২ ভাইরাসের বিরুদ্ধে কত শতাংশে এন্টিবডি (IgG) তৈরি হয়েছে তা তুলে ধরা। 
 
লক্ষণীয় যে, প্রথম ডোজ টিকা গ্রহণকারীদের মধ্যে ৬২.৩৩ শতাংশের দেহে এন্টিবডি শনাক্ত হয়েছে। অপরদিকে, উভয় ডোজ টিকা গ্রহণকারী জনগোষ্ঠীর ৯৯.১৩ শতাংশের মধ্যে এন্টিবডি শনাক্ত হয়েছে। অথচ যারা ভ্যাকসিন গ্রহণ করেননি তাদের মধ্যে মাত্র ৫০ শতাংশের দেহে প্রাকৃতিকভাবে সার্স কোভ-২ ভাইরাসের বিরুদ্ধে এন্টিবডি (IgG) পাওয়া গিয়েছে 
 

সুতরাং এই গবেষণালব্ধ ফল কোভিড-১৯ অতিমারি মোকাবেলায় দেশে চলমান টিকা প্রদান কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা ও সফলতাকে আলোকপাত করে। 


গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যারা ভ্যাকসিন গ্রহণ করেননি, তাদের শরীরে প্রাকৃতিকভাবে সার্স কোভ-২ ভাইরাসের বিরুদ্ধে যে পরিমাণ এন্টিবডি (IgG) তৈরি হয়েছে (গড়ে ৫৩.৭১ ডিইউ/ মিলি), এর চেয়ে গড়ে প্রায় তিন গুণ বেশি এন্টিবডি (১৫৯.০৮ ডিইউ/ মিলি) তৈরি হয়েছে যারা ভ্যাকসিনের ১ম ডোজ নিয়েছেন এবং প্রায় পাঁচ গুণ এন্টিবডি টাইটার (২৫৫.৪৬ ডিইউ/ মিলি) পাওয়া গেছে যারা ২য় ডোজ গ্রহণ সম্পন্ন করেছেন
 

জরিপে আরোও দেখা গেছে, প্রথম ডোজ গ্রহণের পর ১ম মাসে গড়ে যে পরিমাণ এন্টিবডি (IgG) টাইটার দেহে বিদ্যমান থাকে (১৭৫.১ ডিইউ/ মিলি) তার প্রায় ২৫ শতাংশ হ্রাস পায় ২য় মাসে এসে। কিন্তু ২য় ডোজ টিকা নেওয়ার পর এন্টিবডির পরিমাণ (গড়) সময়ের সাথে হ্রাস পাওয়ার প্রবণতায় ভিন্নতা দেখা যায়। কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের ২য় ডোজ নিয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে গবেষণায় দেখা গেছে, ২য় ডোজ সম্পন্ন করার দুই মাসের মধ্যে গড়ে যে পরিমাণ এন্টিবডি টাইটার থাকে (৩২৪.৪২ ডিইউ/ মিলি) চতুর্থ মাসে এসে তার প্রায় ২১ শতাংশ টাইটার হ্রাস পায়, কিন্তু ৬ষ্ঠ মাসে এসে তা ৪র্থ মাসের মাত্র ৩.৪ শতাংশ হ্রাস পায়। 

সুতরাং এই গবেষণায় একটি বিষয় প্রতীয়মান হয় যে, কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের ২য় ডোজ নেওয়ার ছয় মাস পরেও কোভিড-১৯ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত পরিমাণ এন্টিবডি শরীরে উপস্থিত থাকে। 
 

You May Also Like