‘‘প্রযুক্তি এখন গরুর মাংসের আচারে’’

  • Posted on 11-07-2021 09:52:10
  • National

বগুড়া থেকে সংবাদদাতা ॥ 

প্রযুক্তি যেন মাসুমা ইসলামের (২৬) জীবনে বড় আশীর্বাদ। মুঠোফোনে ‘রং নাম্বার’ থেকে রাজিবুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর পরিচয়, বিয়ে। আবার করোনায় রাজিবুলের চাকরি চলে গেলে অনলাইন মাসুমাকে দেখাল থমকে যাওয়া জীবনের পথ। করোনা স্বামীর চাকরি কেড়ে নিলেও মাসুমাকে বানিয়েছে উদ্যোক্তা। তিনিই এখন আগলে রাখছেন দুই সন্তান, রাজিবুল আর শাশুড়িসহ পুরো পরিবার। 
মাসুমা ইসলাম থাকেন বগুড়া শহরের সিও অফিস কইগাড়ি এলাকায়। তাঁর স্বামী রাজিবুল ইসলাম চাকরি করতেন শহরের তারকা হোটেল নাজ গার্ডেনে, সহকারী হিসাব ব্যবস্থাপক পদে। গত বছরের এপ্রিলে করোনার সংক্রমণ ও লকডাউন শুরু হলে হোটেল বন্ধ হয়ে যায়। বেকার হয়ে পড়েন তিনি। রোজগার বন্ধ। ঘরে স্ত্রী, দুই সন্তান ও বৃদ্ধ মা। দিশেহারা রাজিবুলের পাশে দাঁড়ান স্ত্রী মাসুমা। বাড়িতে নানা রকম আচার বানানো শুরু করেন তিনি। কিন্তু বিক্রি করবেন কোথায়? সোজা দোকান খোলেন অনলাইনে। অল্প দিনেই সাড়া পান। অর্ডার বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে কাজ। স্বামী রাজিবুলও এসে পাশে দাঁড়ান। বাড়িতে ছোট পরিসরে গড়ে তুলেছেন আচারের কারখানা। 
তবে মাসুমার আচার ব্যবসায় ঝড় তুলেছে গরুর মাংসের আচার। মাসে এখন ৩০ কেজি গরুর মাংসের আচার বিক্রি করেন তিনি। কেজি এক হাজার টাকা। নানা রকম আচারের পাশাপাশি অনলাইনে ঘি, দই, লাচ্ছা সেমাই, হাতের কাজ করা শাড়ি, থ্রিপিসও বিক্রি করেন তিনি। 
মাসুমা ইসলাম বললেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আচারের প্রতি দুর্বল ছিলাম। মায়ের কাছে বিভিন্ন রকম আচার তৈরি করা শিখেছিলাম। শাশুড়ির কাছ থেকেও শিখেছি। এখন তো ইউটিউব থেকে শিখছি আচারের স্বাদ বদলের কৌশল। সর্ষের তেল দিয়ে বানালে এক রকম স্বাদ। অলিভ অয়েল দিয়ে বানালে একই জিনিস আরেক রকম স্বাদ হয়। মজাই লাগে।’ 
শুরুতে আম, জলপাই, বরই, আমলকী, রসুন, মরিচের আচার তৈরি করেছেন মাসুমা। সবচেয়ে বেশি সাড়া মিলছে গরুর মাংসের আচারে। আচারের পাশাপাশি ঘি, বগুড়ার দই, সর্ষের তেলসহ নানা পণ্য অনলাইনে সরবরাহ করছেন তিনি। নিজের ব্র্যান্ডের নাম দিয়েছেন আরএস ফুড কর্নার। গরুর মাংসের আচার ১০০০, রসুনের আচার ৬০০ এবং আমসহ অন্যান্য আচার ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সারা দেশ থেকে অর্ডার আসছে। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতি মাসে গড়ে ৫০ হাজার টাকার শুধু আচার বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য পণ্য বিক্রি থেকে মাসে আয় গড়ে ২০ হাজার টাকা। এ থেকে যে লাভ হয়, তাতেই তাঁদের সংসার চলছে। 
মাসুমা ইসলামের জন্ম গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার হায়াত খানচালা গ্রামে। তিন বোন, দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় তিনি। এসএসসি পাসের পর ২০১০ সালে কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ একরাতে মুঠোফোনে অচেনা নম্বর থেকে কল আসে। রং নম্বরে পরিচয় হয় রাজিবুলের সঙ্গে। বাড়ি বগুড়া। চাকরি করেন সেখানকার হোটেলে। পদ সহকারী হিসাব ব্যবস্থাপক। মাসখানেক নিয়মিত কথা চলল। দ্রুতই বিয়ের প্রস্তাব দিলেন রাজিবুল। মা-বাবা অন্য জায়গায় বিয়ে ঠিক করেছিলেন। রাজিবুল বললেন, “এক কাপড়ে চলে এস।” পরদিন সত্যিই চলে এলাম। এরপর বিয়ে। ২০১২ সালে বড় মেয়ে রিসার জন্ম হলো। গত বছরের সেপ্টেম্বরে আরেক সন্তানের মা হলাম। বড় মেয়ে শহরের স্কুলে পড়ে।’ এক নিশ্বাসে বলে গেলেন মাসুমা। 


সুখের ঘরে করোনার আঘাত 
মাসুমা ইসলাম বলেন, রাজিবুলের চাকরিতে সংসার মোটামুটি চলে যাচ্ছিল। কিন্তু গত বছরের ৭ এপ্রিল রাজিবুল চাকরি হারান। চার মাস এভাবে চলল। আয়-রোজগার না থাকায় সংসার প্রায় অচল। সন্তানের পড়ালেখার কী হবে? মাসুমা বলেন, ‘দিশেহারা অবস্থা। এ সময় অনলাইনে পণ্য বিক্রির চিন্তা মাথায় আসে। প্রথমে চার কেজি আলুর চিপস তৈরি করে ফেসবুকে পেজ খুলে পণ্যের ছবি আপলোড করি। খবর পাই উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরামের (উই)। উই প্ল্যাটফর্মে পণ্যের ছবি দিই। স্বল্প সময়ে আলুর চিপস বিক্রি করে হাজারখানেক টাকা লাভ হয়। এরপর বাড়িতে ঝুরি চানাচুর তৈরি করে অনলাইনে দিই। এতেও সাড়া মিলল। পরে সিরাজগঞ্জ থেকে তাঁতের শাড়ি কিনে এনে অনলাইনে বিক্রি করা শুরু করি। হাতের কাজ করা থ্রিপিসও বিক্রি করছি। তবে পোশাকের চেয়ে খাদ্যপণ্যে বেশি সাড়া পেলাম। তাই এতেই বেশি জোর দিলাম।’ 


গরুর মাংসের আচার 
‘একদিন ইউটিউবে গরুর মাংসের আচার তৈরির রেসিপি চোখে পড়ল। বাজার থেকে দুই কেজি গরুর মাংস কিনে এনে বাড়িতে সে আচার তৈরি করলাম। অনলাইনে আচারের ছবি দিলাম। ক্রেতাদের সাড়া দেখে অবাক হলাম। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন প্রতি মাসে গড়ে ৩০ কেজি মাংসের আচার অনলাইনে বিক্রি করি’, বললেন মাসুমা ইসলাম। 
এই আচারের রেসিপি জানালেন মাসুমা। হাড় ছাড়ানো গরুর মাংসকে আধা ইঞ্চি মাপে স্কয়ার করে টুকরা করতে হবে। মাংসের পরিমাণ অনুযায়ী তাতে পেঁয়াজকুচি, আদা, রসুন, সর্ষেবাটা, ধনে, মরিচ, হলুদ, লবঙ্গ, লবণ ও পরিমাণমতো পানি দিয়ে মেখে নিতে হবে। এরপর ২০ মিনিট থেকে আধঘণ্টা সেদ্ধ করতে হবে। সেদ্ধ হওয়ার পর মাংসের গায়ের পানি ভালো করে ঝরিয়ে নিতে হবে। এরপর একটি কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে তেজপাতা, পাঁচফোড়ন, দারুচিনি, শুকনো মরিচ, গোটা রসুন দিয়ে সেদ্ধ মাংস ভাজা ভাজা করে নিতে হবে। অল্প আঁচে মাংস ভাজতে হবে। সেই ভাজা মাংসে আবার গরমমসলা, পাঁচফোড়ন, বেশি পরিমাণে আম বা জলপাইয়ের আচার, ভিনেগার বা লেবুর রস দিয়ে কয়েক মিনিট চুলার আঁচে রেখে দিতে হবে। এরপর ঠান্ডা করে কাচের বয়ামে ঢেলে নিতে হবে। তেলে মাংস প্রায় ডুবে থাকবে। এতে বেশি সময় ধরে এটা সংরক্ষণ করা যাবে। মাঝেমধ্যে রোদে দিতে হবে। রোদ না পেলে বা ঝুঁকি মনে করলে রেফ্রিজারেটরেও রাখা যায়। 
মাসুমা ইসলাম বলেন, গরুর মাংসের এই আচার খুব মজার ও লোভনীয়। খিচুড়ি, পোলাও, সাদা ভাতের সঙ্গে খাওয়া যায়। সর্ষের তেলে মাংস ডুবে থাকে বলে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। মাসুমা জানান, সারা দেশেই তাঁর আচারের বাজার রয়েছে। তবে বগুড়া, রাজশাহী, খুলনা, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, রংপুর, দিনাজপুর, গাজীপুর থেকে বেশি অর্ডার আসে এই আচারের। দেশের বাইরে আমেরিকা, লন্ডন, দুবাই , মালয়েশিয়া, চীন, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুরেও এই আচার পাঠিয়েছেন তিনি। উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম (উই) গ্রুপে সবচেয়ে বেশি আচার বিক্রি হয়। উই ছাড়া ঢাকা বিজনেস গ্রুপ, খুলনা বিজনেস সোসাইটি, বগুড়া বিজনেস কেয়ার, বগুড়া বিজনেস গ্রুপ, ভিক্টোরিয়া ই-কমার্স ফোরাম, হামরা দিনাজপুরিয়া, উদ্যোক্তা, উদ্যোক্তা হওসহ নানা গ্রুপে মাসুমা তাঁর পণ্য বিক্রি করেন। 
সম্প্রতি গিয়ে দেখা গেল, মাসুমা ইসলামের বাড়ি পুরোটাই যেন আচারের কারখানা। একদিকে উপকরণ তৈরি হচ্ছে। কোনোটা রোদে শুকানো হচ্ছে, কিছু চুলায় পাক দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি তৈরি হচ্ছে গরুর মাংসের আচার। ঠান্ডা হলে তা আবার কাচ ও প্লাস্টিকের বয়ামে ভরা হচ্ছে। অর্ডার অনুযায়ী বয়াম চলে যাবে কুরিয়ার সার্ভিসে। বয়স্ক শাশুড়িও বসে নেই। তিনিও সহযোগিতা করছেন। 
মাসুমা ইসলামের স্বামী রাজিবুল ইসলাম বলেন, ‘করোনায় চাকরি হারিয়ে সংসার নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। সংকটে স্ত্রী নতুন পথের সন্ধান দিলেন। এখন কাঁচামাল কেনা, কুরিয়ারে পণ্য বুকিং দেওয়ার মতো কাজে আমি তাকে সহযোগিতা করি।’ 
করোনা মাসুমার পরিবারকে পথে বসাতে চেয়েছিল। কিন্তু সেখান থেকে তাঁরা পথ বের করে নিয়েছেন। করোনা এখনো শেষ হয়নি। কিন্তু এরই মধ্যে গৃহিণী থেকে সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠলেন মাসুমা। মাসুমা বললেন, ‘এখন স্বপ্ন ব্যবসাটাকে অনেক দূর নিয়ে যাওয়া। আরও নানা রকম ভোগ্যপণ্য তৈরি করতে চাই আমি।’ 
 

You May Also Like