ডেইরি শিল্পের করপোরেট রূপান্তর

আমাদের দেশে দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধির পথে প্রধান বাধাগুলো হচ্ছে  অপর্যাপ্ত জমি, গবাদি পশুর পর্যাপ্ত খাবারের স্বল্পতা ও অস্থিতিশীল খাদ্যমূল্য এবং গরুর উৎপাদন ক্ষমতা। খামারগুলোয় গাভীর জাত, বাসস্থান, খাদ্য ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও গতানুগতিক বিধায় দুগ্ধ উৎপাদন কম। দুগ্ধ বাজারজাতকরণেও আমাদের কোনো সমন্বিত বিপণন ব্যবস্থা নেই। এছাড়া  বাস্তবমুখী সমাধান পেতে উন্নত প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও বিপণন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। 

প্রথমত, জমির পরিমাণ বৃদ্ধি করা যেহেতু সম্ভব নয়, সেহেতু উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির দিকেই নজর দিতে হবে। ক্রমবর্ধমান দুধ ও মাংসের চাহিদা  মেটাতে উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি অধিক উৎপাদনশীল উন্নত জাতের গাভী লালন-পালন করা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণত ভালো মানের একটি গরু দিনে ৬২ লিটার দুধ দেয়। আমেরিকায় গড়ে প্রতিটি গরু ৫২ লিটার দুধ দেয়। আমাদের খামারগুলোয় গড়ে প্রতিটি গরু পাঁচ-ছয় লিটার দুধ দেয়। এর বাইরে যে গরু আছে, সেসব দু-তিন লিটার দুধ দেয়। খামারে দেশী জাতের গরু রয়েছে ৮০ শতাংশ। সংকর জাতের আছে ২০ শতাংশ। সংকর জাতের গরুর সংখ্যা বাড়াতে পারলে দুধের উৎপাদন বাড়বে। গত পাঁচ বছরে লিটারপ্রতি দুধের উৎপাদন ব্যয় কমেছে। সংকর জাতের গরুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ খরচ কমেছে। কিন্তু এখনো সব খামারির কাছে সংকর জাতের গরু নেই। কৃষক পর্যায়ে এ জাতের গরু পৌঁছে দিতে পারলে দুধের উৎপাদন খরচ আরো কমবে। তখন ভোক্তারাও কম দামে দুধ ক্রয় করতে পারবে। এছাড়া আমাদের দেশে অস্ট্রেলিয়ান, জার্সি, ন্যাড়ামুন্ডো, হরিয়ানা ও সিল্কি জাতের গাভী বেশি পালন করা হয়। যদি কানাডা, ইংল্যান্ড, জার্মানি, আমেরিকার মতো দেশ থেকে উন্নত জাতের বীজ আনা যায়, সেক্ষেত্রে খামার ব্যবসায়ীরা আরো বেশি উপকৃত হবেন। তখন দুধ উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো যেমন ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকাসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর হাই-টেক ডেইরি খামার স্থাপন করে দুগ্ধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করছে। আমাদেরও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন হাই-টেক খামার স্থাপনে উদ্যোগ নিতে হবে। 

দ্বিতীয়ত, পশুখাদ্যের মূল্য সহনীয় করতে পশুখাদ্যের নিয়ন্ত্রণ ও শুল্কমুক্ত আমদানি শুধু করোনাকালীন নয়, সব সময়ই উন্মুক্ত রাখা প্রয়োজন। পশু পালনের জন্য ব্রিডিং, ভ্যাকসিন ও সিমেন উন্মুক্ত রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে বেসরকারি যত সিমেন প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের কর্মীদের দক্ষতা, সিমেনের মান এবং সেই সিমেন সরকারি প্রজনন নীতিমালায় অনুমোদিত কিনা তা  কঠোর নজরদারির মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। সারা দেশে স্বল্প সুদে ডেইরি খামারি-ব্যবসায়ীদের পর্যাপ্ত ঋণ প্রদান, উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ব্যাংক ও এনজিও কর্তৃক আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং পশু বীমা চালুর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। ভারতে   দুধ উৎপাদনে খামারিদের ভর্তুকি দেয়া হয়। একইভাবে বাংলাদেশের খামারিদের ভর্তুকি দেয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এছাড়া  দেশে বিভিন্ন অঞ্চলে খামারিদের সমবায়ের মাধ্যমে একত্র হয়ে গো-খাদ্য প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র, দুগ্ধ বিক্রয়কেন্দ্র ইত্যাদি গড়ে তুলতে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করতে হবে, যাতে স্বল্প খরচে স্থানীয় ও মাথাপিছু চাহিদা পূরণ সম্ভব হয়। 

তৃতীয়ত,  ডেইরি বা অন্যান্য পশুপালন ও প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে।  
আমাদের দেশের মানুষদের মাঝে দুধ জনপ্রিয় না হওয়ার পেছনে প্রচারণার অভাব রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রচার করা হয়। আবার কখনো কখনো বাজারে আসলেই পর্যাপ্ত পরিমাণ মানসম্পন্ন দুধের ঘাটতি দেখা যায়। যেমন দুধে বেশি পরিমাণ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি। আন্তর্জাতিক নিয়ম হলো, প্রতি মিলি লিটার দুধে সর্বোচ্চ দুই লাখ ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারবে। বাংলাদেশে প্রতি মিলিলিটার দুধে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ ২০ লাখের বেশিও পাওয়া যায়। তাই নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। ডেইরি প্রক্রিয়াজাত খামারগুলোর বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্য বাজারে আনার চেষ্টা চালাতে হবে। গরমে তৃষ্ণা মেটাতে আমরা যে বিভিন্ন ঠা-া ও কোমল পানীয় পান করি, তাতে পুষ্টি পরিপূরক কোনো উপাদান নেই। কিন্তু পরিশুদ্ধ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে যদি এসব পানীয়র বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন ফ্লেভারযুক্ত গরুর দুধ বাজারজাত করা যায়, তাহলে জনপ্রিয়তা লাভের পাশাপাশি আমরা আর্থিকভাবে এবং স্বাস্থ্যগতভাবে লাভবান হতে পারব। যেমন ভারতে মহিষের দুধ হিসেবে আমুল, কুল ইত্যাদি বোতলজাত দুধ খুবই জনপ্রিয়। এছাড়া আমাদের দেশে গুঁড়ো দুধ আমদানিতে প্রতি বছর ব্যয় হওয়া অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। 

You May Also Like