সমুদ্রের প্রাণীদের জন্য চাই বিশেষ মনোযোগ

কক্সবাজার থেকে সংবাদদাতা ॥ 

কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন উপকূলে একের পর এক ডলফিন, তিমিসহ সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর মৃত্যু হচ্ছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবেশবাদী ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা। গত ১৬ মাসে বাংলাদেশের উপকূলে পাঁচটি তিমির মরদেহ ভেসে এসেছে। কিন্তু একটিরও মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি। কারণ, সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর মৃত্যুর কারণ জানার জন্য দক্ষ গবেষক ও প্রযুক্তি নেই বাংলাদেশের। গত এপ্রিল মাসে দুটি তিমি এবং ২ মে একটি ডলফিনের মরদেহ ভেসে আসে কক্সবাজারের সৈকতে। পরে গত ৯ মে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতেও একটি মৃত ডলফিন ভেসে আসে। আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা ডব্লিউসিএসের (ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে ১৮৪টি ডলফিন, ১৪টি পরপয়েস ও ১০টি তিমি মারা গেছে। এর মধ্যে এই তিন প্রজাতির ২৩টি প্রাণী মারা গেছে চলমান করোনাকালে। 
কক্সবাজারের পরিবেশবাদী সংগঠন সেইভ দ্য নেচার অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসাইন জানান, তিমি মারা যাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ জানার জন্য টেস্ট কিট বাংলাদেশে নেই। দেশে শুধু প্রজাতি শনাক্তের প্রযুক্তি আছে। 
মোয়াজ্জেম হোসাইন বলেন, আমাদের দেশে সামুদ্রিক প্রাণী রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও বন বিভাগের। বন কর্মকর্তাদের বণ্যপ্রাণী সম্পর্কে পড়াশোনা থাকলেও সামুদ্রিক প্রাণী সম্পর্কে তেমন জ্ঞান নেই। নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও। মারা যাওয়া বেশিরভাগ ডলফিনের কোনো সুরতহাল রিপোর্টও হয়নি। ফলে সামুদ্রিক প্রাণী মৃত্যুর কারণ অজানাই থেকে যাচ্ছে। 
এমন পরিস্থিতিতে গত ২২ মে শনিবার বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস পালিত হয়। প্রতি বছরের মতো এবারও বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হয়। করোনাকালে এবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। ২২ মে সকাল ১১টায় ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা) 'জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশগত অবদান সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় নীতি সংস্কার' শীর্ষক অনলাইন আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে  গত বছরের ২৩ মার্চ কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ২০-২৫টি ডলফিনকে খেলা করতে দেখেন স্থানীয়রা। ওই দৃশ্য দেখে সমুদ্র উপকূলের পরিবেশ প্রতিবেশের উন্নতি ঘটেছে বলেও মনে করেন তারা। কিন্তু এপ্রিলের শুরু থেকেই একের পর এক ডলফিনের মৃতদেহ উপকূলে ভেসে আসতে থাকে। গত বছরের এপ্রিল ও মে মাসে কক্সবাজার ও টেকনাফে পাঁচটি ডলফিন মারা যায় বলে জানিয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠন সেইভ দ্য নেচার অব বাংলাদেশ। চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে ভেসে আসছে মৃত তিমি। বৈশিষ্ট্যগতভাবে ডলফিন আকর্ষণীয় প্রাণী। ডব্লিউসিএস এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ১২ প্রজাতির জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণী শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে ডলফিন সাত প্রজাতির, তিমি চার প্রজাতির এবং পরপয়েস এক প্রজাতির। 
ডলফিন ও তিমির প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি বলে মনে করেন ডব্লিউসিএস বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, ডলফিন, তিমি ও পরপয়েসের মৃত্যুর জ্ঞাত কারণসমূহ বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি বছর ফাঁস জাল ৭৪ শতাংশ, বেহুন্দি জাল ১০ শতাংশ ও টানা বড়শিতে ৭ শতাংশ আটকা পড়ে এবং নৌকা-জাহাজের প্রপেলারে ৮ শতাংশ আঘাত পেয়ে মৃত্যু ঘটে। এ ছাড়া নদীদূষণ, উজানে বাঁধের ফলে নদীর নাব্য হ্রাস, নির্বিচারে এদের খাদ্য মাছ ও চিংড়ি নিধন এদের বিপন্ন করে তুলছে। এদের সংরক্ষণের জন্য ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকার বেশ কয়েকটি অভয়াশ্রম তৈরি করলেও কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতামূলক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু হয়নি। বাংলাদেশ থেকে ইতোমধ্যে ৩০ জাতের প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে জানিয়ে ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কোনো এলাকা থেকে একটি প্রাণী হারিয়ে যাওয়ার অর্থ ওই এলাকা থেকে আরও অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। ফলে সংরক্ষিত এলাকার কার্যকর ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি।সেইভ দ্য নেচার অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসাইন সামুদ্রিক জীববৈচিত্র রক্ষার জন্য সমুদ্র কমিশন গঠনের দাবি জানান। তিনি বলেন, বহু প্রাণী আহত হয়ে সমুদ্রে পড়ে থাকলেও তাদের উদ্ধারে কোনো দল নেই। সামুদ্রিক প্রাণীর চিকিৎসা দেওয়ার মতো বাংলাদেশে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। আহত সামুদ্রিক প্রাণীর আপৎকালীন সুরক্ষার জন্য ওশানারিয়াম (সংরক্ষণাগার) নেই। ফলে আহত প্রাণীকে সমুদ্রেই ছেড়ে দিতে হয়। তাদের চিকিৎসা, আশ্রয় ও খাদ্যের জন্য কোনো পরিকল্পনা নেই। পরিবেশ অধিদপ্তর, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, সামুদ্রিক গবেষণা ইনস্টিটিউট‘সহ সংশ্নিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। জাতীয় সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু সাঈদ মুহাম্মদ শরীফ বলেন, তিমি ও ডলফিনের মৃত্যুর কারণ জানার মতো সক্ষমতা আমাদের নেই। সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের বয়স আড়াই বছর। জনবল, অবকাঠামো এবং যন্ত্রপাতির তীব্র সংকট রয়েছে। প্রত্যেক প্রাণীর জন্য আলাদা আলাদা বিশেষজ্ঞ নেই। যে অল্প কয়েকজন আছেন, তাদের সামুদ্রিক সব প্রাণী সম্পর্কে জ্ঞান নেই। প্রাণীর ফরেনসিকের জন্য কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। ফলে অনুমান করে কিছু বলা যাবে না। তিনি বলেন, কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে মারা যাওয়া তিমির নমুনা বন বিভাগের ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। তাদেরও সেই সক্ষমতা নেই। ফলে তারা এখনও ফলাফল দিতে পারেনি। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারিতে যোগাযোগ করেছি, তারা তাদের দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তি নেই বলে জানিয়ে দিয়েছে। 
 

You May Also Like