ধান সংকটে বন্ধ ৮০ ভাগ মিল

কুষ্টিয়া থেকে সাজ্জাদ রানা ॥ 

লিয়াকত হোসেন রাইস মিল। কুষ্টিয়ার বটতৈল এলাকার এ রাইস মিলটি এক মাস ধরে বন্ধ। মিলের গোডাউনও ফাঁকা পড়ে আছে। কিছু বস্তা ছাড়া আর কিছু নেই। ধান সংকট ও পুরাতন ধানের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় মিলটি বন্ধ রেখেছেন মালিক হাজী লিয়াকত হোসেন। নতুন ধান ওঠার আশায় আছেন তিনি। মিল না চালাতে পেরে সব শ্রমিককে ছুটি দিয়েছেন। বসিয়ে বেতন দিচ্ছেন কয়েকজন কর্মচারীকে। 

হাজী লিয়াকত হোসেনের মতো দেশের বৃহত্তর চাল মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগর এলাকার ৮০ ভাগ মালিক ধান সংকটে তাদের মিল বন্ধ রেখেছেন। এতে সংকটে পড়েছেন মালিক-শ্রমিক উভয়ই। যে কয়েকটি অটো মিল চালু রয়েছে তাদের উৎপাদন অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। প্রতিদিন খাজানগর মোকাম থেকে যেখানে শতাধিক ট্রাক চাল ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের নানা জেলায় যেত সেখানে এখন হাতেগোনা ১০ থেকে ২০ ট্রাক চালও যাচ্ছে না। চাল সরবরাহ ব্যবস্থায় ভাটা পড়েছে। এতে দাম আরও কয়েক টাকা বেড়েছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে খাজানগর মোকামে এমন অবস্থা দেখা যায়নি বলে জানালেন মালিকরা। অন্যান্য বছর মালিকদের ঘরে ধান মজুদ থাকলেও এবার ধান ও চালের কোনোটাই মজুদ নেই। 
সরেজমিন খাজানগর মোকাম ঘুরে দেখা গেছে, যেখানে অন্য সময় শ্রমিকদের পদচারণা ও মিলের যান্ত্রিক আওয়াজে মুখর থাকে, সেখানে অনেকটা নীরব। বেশিরভাগ চাতাল খালি পড়ে আছে। ধান নেই। শ্রমিকদের থাকার খুপরি ঘরগুলোও তালা মারা। বেশিরভাগ শ্রমিক কাজ না থাকায় চলে গেছে। অন্য কাজ করছেন অনেকে।  
আবদুল্লাহ, রাইস মিলসহ বেশ কয়েকটি মিল ঘুরে দেখা গেছে, বস্তা সেলাই করছেন শ্রমিকরা। নতুন ধান কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এসব মিলে আগের কোন ধান ও চাল নেই। তাই ব্যবসা বন্ধ।  
খাজানগর এলাকায় হাসকিং (ম্যানুয়াল) মিলের সংখ্যা বেশি। এখানে ৩ শতাধিক মিল রয়েছে। আর অটোমেটিক মিল রয়েছে ৪৬টি। হাসকিং মিলের প্রায় সব বন্ধ রয়েছে। আর কয়েকটি অটো মিল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কয়েক ঘণ্টা চলছে মাত্র। তারাও ধানের কারণে মিল চালাতে পারছেন না। মিল বন্ধ থাকায় বেকার হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার শ্রমিক। ধান ও চাল সরবরাহ বন্ধ থাকায় ট্রাকচালক ও শ্রমিকরাও বিপাকে পড়েছেন। তারা মালিকদের কাছ থেকে ধারে টাকা নিয়ে চলছেন। 

খাজানগর এলাকার অন্যতম বৃহৎ চাল ব্যবসায়ী ও চালকল মালিক সমিতির একাংশের সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন প্রধান বলেন, 'তাদের কয়েকটি অটো মিল রয়েছে। ধান না থাকায় মিল বন্ধ রেখেছেন। খাজানগর থেকে চাল সরবরাহ এ বছর কমে একেবারে তলানিতে। হাতেগোনা কয়েকটি মিল চালু রয়েছে। আর সব মিল বন্ধ। নতুন ধান বাজারে এলে তারা আবার উৎপাদনে ফিরবেন।' 
লিয়াকত হোসেন রাইস মিলের মালিক হাজী লিয়াকত হোসেন বলেন, এমন সংকট গত কয়েক বছরে তারা দেখেননি। অন্যান্য বছর মিল পুরোপুরি বন্ধ হয় না। তবে এবার ধান না থাকায় তারা উৎপাদন এক মাস বন্ধ রেখেছেন। হাওরাঞ্চলে নতুন ধান উঠছে। তবে দাম বেশি। মিল চালু হতে আরও ২০ দিন অপক্ষো করতে হবে। খাজানগরে এখন কোনো ব্যবসা নেই। সবাই লোকসান গুনছে। 
মিল মালিকরা জানান, সারাদেশের চালের বড় অংশ জোগান হয় খাজানগর থেকে। সারাবছরই মিলগুলো চালু থাকে। বোরো মৌসুমেও পুরাতন ধান দিয়ে মিল চালু রাখা হতো। এবার সে অবস্থা নেই। মিলগুলোতে কোনো ধান মজুদ নেই। প্রতিদিন এ মোকাম থেকে গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ ট্রাক চাল যায় দেশের বাজারগুলোতে। কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়। গত এক মাস ধরে একে একে বন্ধ হয়ে গেছে মিল। 
মিল মালিকরা আরও জানান, নতুন ধানের বাজারও বেশি। হাওরে প্রতি মণ ধান এখনই বিক্রি হচ্ছে হাজার টাকার কাছে। কয়েক মাস পরই এ দাম আরও বাড়বে। নতুন ধান উঠলেও চালের বাজার কমার কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এ ছাড়া দেশের নানা জেলায় ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এর প্রভাব বাজারে পড়বে।  
কুষ্টিয়া পৌর বাজারের পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা আশরাফুল ইসলাম বলেন, এক সপ্তাহ ধরে মোকামে ঘুরে চাল পাওয়া যাচ্ছে না। অগ্রিম টাকা দিলেও কোনো মিল মালিক চাল দিতে পারছেন না। ৫ রকম চালের চাহিদা দিয়েছেন। পেয়েছেন মাত্র এক জাতের চাল। তিনি বলেন, 'মিল মালিকদের হাতে এখন প্রচুর টাকা আছে। তাদের গোডাউন ফাঁকা। নতুন ধান উঠলেই তারা প্রতিযোগিতায় নেমে পড়বেন। এখনই তাদের লোকজন নানা জেলায় ছড়িয়ে পড়েছেন। প্রচুর ধান কিনে রাখবেন তারা। সামনে ধান ও চালের বাজার কমার সম্ভাবনা নেই তেমন একটা। বাইরে থেকে চাল না এলে সংকট তৈরি হবে।' ফ্রেশ এগ্রোর মালিক ও চালকল মালিক সমিতির একাংশের সভাপতি ওমর ফারুক বলেন, 'ধানের সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। দেশের কোনো বাজারে পুরাতন ধান নেই। নতুন ধান উঠতে আরও কয়েক সপ্তাহ লাগবে। মিলগুলো সব ধুঁকছে। হাসকিং মিল মালিকরা অনেক আগেই মিল বন্ধ রেখেছেন। বাজারে চাল সরবরাহ নেই বললেই চলে। তবে নতুন ধান উঠলে সংকট কেটে যাবে ইনশাআল্লাহ।'  
 

You May Also Like