মাঠে চোখ জুড়ানো পার্পল লিফ রাইস

ফয়সাল আহমেদ ॥ 

আবহমানকাল থেকে সবুজ রঙের ধান গাছই দেখে এসেছে বাংলার কৃষক। কিন্তু এখন কৃষকের জমিতে শোভা পাচ্ছে বেগুনি ধান (পার্পল লিফ রাইস)। বেশ কয়েক বছর ধরে বেগুনি ধানের চাষ হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। চলতি বোরো মৌসুমে প্রথমবারের মতো গাজীপুরের শ্রীপুর ও কাপাসিয়া উপজেলায় এ জাতের ধানের চাষ হয়েছে। দৃষ্টিজোড়ানো এই ধান বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে অনেকের মধ্যে। 
গাজীপুর কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, এবার জেলার এ দুটো উপজেলায় ০.৫৮০ হেক্টর জমিতে বেগুনি ধানের চাষ হয়েছে। সড়কের পাশের এ জমিতে এ জাতের ধান চাষ হওয়ায় বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যেই। এদিকে শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার ধানশাইল এলাকায় স্কুল শিক্ষক নূরে আলম সিদ্দিকী প্রথমবার ভিন্ন রঙের এই ধান তার দুই খন্ড জমিতে চাষ করেছেন। এতে স্থানীয় পর্যায়ে কৌতূহল ও বিস্ময়ের জন্ম হয়েছে। নূরে আলম ধানশাইল উচ্চ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তার ধানক্ষেতটি অনেকটা জাতীয় পতাকা আকৃতির। 
গাজীপুর জেলা কৃষি বিভাগ জানান, এ ধানের জাত এখনো আমাদের দেশে অনুমোদন পায়নি। দেখতে সৌন্দর্যমন্ডিত হলেও এর বিশেষ কোনো গুণের কথা এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। এ জাতের 
উদ্ভাবক আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইন্সস্টিটিউট। এর উৎপাদনও খুব বেশি নয়, হেক্টরে মাত্র ৪/৫ টন। সাধারণত এ জাতের ধান গাছের মাধ্যমে বিস্তৃত ধানের জমিতে মার্জিন দিতে ব্যবহার হয়। কৃষি বিভাগ সবসময় উচ্চফলনশীল জাতের ধান চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে, তাই যেহেতু এ ধানের ফলন তেমন নেই, তাই এ জাতের ধান চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করা হয়। 

শ্রীপুরের বেকাশহরা গ্রামের কৃষক এনামুল হক জানান, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ জাতের ধানের কথা জানতে পারেন। পরে অনেকটা শখের বশে বীজ সংগ্রহ করে টেংরা-বরমী সড়কের পাশে ৩৫ শতাংশ জমিতে এ ধানের চাষ করেন। ভরা মৌসুমে এখন দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে তার ধানের জমি। পথচারীসহ অনেকেই এ ধান দেখতে পেয়ে একটু দাঁড়িয়ে এর সৌন্দর্য অবলোকন করেন। এছাড়া শৈলাট গ্রামের কৃষক আব্দুর রশিদও অনেকটা শখের বশে এবার দশ শতাংশ জমিতে বেগুনি ধান চাষ করেছেন। 
গাজীপুর জেলা কৃষি বিভাগের উপপরিচালক মাহবুব আলম বলেন, উচ্চফলনশীল না হলেও অনেকেই শখের বশে এ জাতের ধান চাষ করছেন। তবে কৃষকদের বড় পরিসরে করার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কেননা সৌন্দর্য ছড়ানো ছাড়া এর বিশেষ কোন গুণের কথা এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। 
ঝিনাইগাতী কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রথম বেগুনি রঙের ধানের আবাদ শুরু হয় গাইবান্ধায়। সৌন্দর্য ও পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ধান। এ ধানের নাম ‘পার্পল লিফ রাইস। এই ধানগাছের পাতা ও রং বেগুনি। এর চালের রঙও বেগুনি। তাই কৃষকদের কাছে এখন পর্যন্ত এ ধানের পরিচিতি বেগুনি রঙের ধান বা রঙিন ধান।  
গত সপ্তাহের মঙ্গলবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, চারপাশে সবুজ ধানখেতের চতুর্ভুজ ও মাঝখানে বৃত্ত আকৃতির বেগুনি রঙের ধানের আবাদ। চারদিকে বিস্তৃত সবুজ ধানখেতের মধ্যে বেগুনি রঙের এই ধানগাছ দেখে কেউ কেউ থমকে দাঁড়িয়ে জানার চেষ্টা করছেন, এটি কি ধান বা ধানের এমন অবস্থা কি করে হলো? অনেকেই তুলছেন সেলফি। 

নূরে আলম সিদ্দিকী তিনি বলেন, ইউটিউবে বেগুনি রঙের ‘পার্পল লিফ রাইস’ নামের এ ধান চাষ দেখেন। পরে তার মাঝেও এ ধান চাষের আগ্রহ জাগে। এ ধানের বীজ সংগ্রহের অনেক চেষ্টার পর, শালচূড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হান্নানের মাধ্যমে স্থানীয় আদিবাসী এক কৃষকের মাধ্যমে বীজ সংগ্রহ করেছেন। এখন পরীক্ষামূলকভাবে দুই খন্ড (১০ শতক) জমিতে ধান রোপণ করেছেন। 
তিনি আরও বলেন, এছাড়া প্রায় এক একর জমিতে ‘বাংলা মতি’ ও কাটারিভোগ’ ধানের চারা ধান রোপণ করেছেন। এসব ধানের ফলন কী রকম হবে, তা দেখার পর ভবিষ্যতে আবাদ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন এই ধান দেখতে প্রতিদিন মানুষ ভিড় করছে। অনেক কৃষক এই ধান চাষ করতে বীজ চেয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। 
দাঁড়িয়ারপাড় এলাকার কৃষক তারেক হোসাইন বলেন, ‘আমি প্রথমে দেখে ভেবেছিলাম, ধানক্ষেত নষ্ট হয়েছে। পরে জিজ্ঞেস করার পর জানতে পারলাম, এটি বেগুনি রঙের ধান। স্যার (নূরে আলম) এমনভাবে রোপণ করেছেন, দেখে মনে হয় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। আগামীতে আমিও চাষ করব ইনশাআল্লাহ।’ 
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, এর আগে কখনো এ উপজেলায় এ ধানের চাষ দেখেনি। বেগুনি রঙা ধান চাষ হওয়ার খবর শুনেছেন তারা। এই ধানের পুষ্টিমান বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 
তিনি আরও বলেন, এ চালের ভাত খেতেও সুস্বাদু। এই ধান ডায়াবেটিস রোগীদের বেশ উপকারী। ফলন ভালো হলে উৎপাদিত ধানগুলো বীজ আকারে রাখা হবে। এছাড়া ভবিষ্যতে ধানের আবাদ বৃদ্ধির চিন্তা করছেন বলে জানিয়েছেন তারা।  
 

You May Also Like