মৎস্য ও পশুখাদ্যের গুণগত মান সনদ নিয়ে বেকায়দায় খাদ্য প্রস্তুতকারকরা

ঢাকা অফিস ॥

মান সনদ নিয়ে দুই সংস্থার টানাটানিতে বেকায়দায় পড়েছেন মৎস্য ও পশুখাদ্য প্রস্তুতকারকরা। শিল্প মন্ত্রণালয়ের একটি এসআরও জারির মাধ্যমে বর্তমানে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) মৎস্য ও পশুখাদ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মান সনদ দিচ্ছে। কিন্তু দেশে প্রচলিত আইনে এসব প্রতিষ্ঠানকে তদারকি করছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দুটি প্রতিষ্ঠান প্রাণিসম্পদ এবং মৎস্য অধিদপ্তর। এখন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, খাদ্যের গুণগতমান নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে, তাই তারা মান সনদ দেবে। অন্যদিকে বিএসটিআই বলছে, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত এসআরওতে প্রাপ্ত ক্ষমতা বলে কার্যক্রম চলতে থাকবে। এই অবস্থায় জনস্বার্থে বিষয়টি দ্রুত মীমাংসার তাগিদ দিয়ে দুই সংস্থাকে চিঠি দিয়েছেন খাদ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। 
উদ্যোক্তারা বলছেন, বিএসটিআইর সিএম সার্টিফিকেট গ্রহণের পূর্বে বিশাল অঙ্কের ফি তিন বছরের একত্রে জমা দিতে হয়। যা কোম্পানি ভেদে ৫০ লাখ থেকে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত। এতে করে ফিড মিলগুলোতে মূলধনের সংকটে রয়েছে। এছাড়া ছোট ছোট ফিড মিলগুলোর পক্ষে উৎপাদন চালু রাখা কষ্টকর হবে। দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের কারণে খাদ্য প্রস্তুতকারকরা একদিকে যেমন বিভ্রান্ত হচ্ছেন, অপরদিকে নানাবিধ হয়রানির শিকার হচ্ছেন।   
এ প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মৎস্য ও পশুখাদ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মান সনদ আমরাই দেব। এজন্য সাভারে একটি আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবও স্থাপন করা হয়েছে। এই ল্যাবের মাধ্যমে মান সনদ দেওয়া গেলে পশুখাদ্যের গুণগত মান পুরোপুরি নিশ্চিত হবে। শিল্প মন্ত্রণালয়কে চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়েছে। আশা করি দ্রুত এটির সমাধান হয়ে যাবে। 

তবে বিএসটিআই বলছে ভিন্ন কথা। জানতে চাইলে সংস্থাটির পরিচালক (সিএম) মো. সাজ্জাদুল বারী বলেন, আমরা এ পর্যন্ত ৩৪টি প্রতিষ্ঠানকে মান সনদ দিয়েছি। এসআরও ক্ষমতা বলে আমরা আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাব। সার্টিফিকেট না নিয়ে কেউ খাদ্য প্রস্তুত করলে ব্যবস্থা নেওয়ারও বিধান রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিএসটিআই তার কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। আর সিদ্ধান্ত নেবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।   

বিদ্যমান আইন ‘মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০’, ‘মৎস্যখাদ্য বিধিমালা-২০১১’ ও ‘পশুখাদ্য বিধিমালা-২০১৩’ অনুযায়ী মৎস্য ও পশুখাদ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো তদারকি করছে–মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দুটি প্রতিষ্ঠান প্রাণিসম্পদ এবং মৎস্য অধিদপ্তর। শুধু উৎপাদনই নয়, বরং নিবন্ধন থেকে শুরু করে এ শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের আমদানি, ফিড রপ্তানি, বিক্রয়, বিতরণ, পরিবহন, আনুষঙ্গিক কার্যাবলি সম্পাদন (মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০ : ধারা২, উপধারা ১৬); এমনকি মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্যের গুণগতমান নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে নমুনা সংগ্রহ, নমুনা পরীক্ষা, মানহীন মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য বাজেয়াপ্ত করার এখতিয়ারও রয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের। 
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মৎস্য ও পশুখাদ্যের মান নিশ্চিতে বিভিন্ন জেলায় ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া সম্প্রতি সাভারে একটি আন্তর্জাতিক মানের অত্যাধুনিক কোয়ালিটি ল্যাবও স্থাপন করা হয়েছে। সে বিবেচনায় দ্বিতীয় কোনো অথরিটি কিংবা কোয়ালিটি ল্যাবের প্রয়োজনীয়তা নেই। উল্লেখ্য, সম্প্রতি সাভারে অবস্থিত দেশে প্রথমবারের মতো স্থাপন করা প্রাণিসম্পদ উৎপাদন উপকরণ ও প্রাণিজাত খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ গবেষণাগারটি (কিউসি ল্যাব) উদ্বোধন করা হয়েছে। ১ দশমিক ৬৪ একর জমির ওপর স্থাপন করা হয়েছে এই ল্যাব। ছয় তলা ল্যাব ও চার তলা ডরমিটরিসহ যন্ত্রপাতি ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হচ্ছে ১০৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। কিন্তু শিল্প মন্ত্রণালয়ের একটি এসআরও জারির মাধ্যমে বিএসটিআই-কে এই ক্ষমতা দিয়ে রেখেছে। 

এ প্রসঙ্গে পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, বিএসটিআইর সিএম সার্টিফিকেট গ্রহণের পূর্বে বিশাল অঙ্কের ফি তিন বছরের একত্রে জমা দিতে হয়। যা কোম্পানি ভেদে ৫০ লাখ থেকে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত। এতে করে ফিড মিলগুলোতে মূলধনের সংকট দেখা দেবে। ছোট ছোট ফিড মিলগুলোর পক্ষে উৎপাদন চালু রাখা কষ্টকর হবে। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের কারণে খাদ্য প্রস্তুতকারকরা একদিকে যেমন বিভ্রান্ত হচ্ছেন, অপরদিকে নানাবিধ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। উদ্ভূত জটিলতা নিরসনে দ্রুত এর সমাধান করা জরুরি। 

একই ধরনের কথা বলেছেন ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ফিআব) সভাপতি এহতেশাম বি শাহজাহান। তিনি বলেন, আইনের বিবেচনায় একই খাতের দুটি ভিন্ন রেগুলেটরি অথরিটি থাকতে পারে কিনা কিংবা দুটি ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি খাত পরিচালিত হতে পারে কিনা সেটিও বিশ্লেষণ করে দেখা প্রয়োজন। ওষুধ খাত শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে হলেও তা ওষুধ প্রশাসনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। এ ক্ষেত্রে বিএসটিআই কর্তৃক মান সনদ গ্রহণে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। 

এ বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এক্ষনি কোনো ব্যবস্থা না নিলে ফিডমিলগুলো জটিলতার কারণে বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং ছোট ছোট ফিডমিলগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। যার কারণে দেশের প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে বাঁধা সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন সেক্টরের সংশ্লিষ্টরা। 
 

You May Also Like