মাছ চাষে নতুন প্রযুক্তি ইনপন্ড রেসওয়ে সিস্টেম

শাইখ সিরাজ // 

কথায় বলে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’। মাছ ধরবেন অথচ পানিতে নামবেন না-সে এক অসম্ভব বিষয় ছিল। কিন্তু প্রযুক্তি সব অসম্ভবকে সম্ভব করে দিয়েছে। এই যেমন গত ফেব্রুয়ারি প্রথম সপ্তাহে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আকবর হোসেনের মাছের খামারে গিয়ে দেখি বিশাল বিশাল মাছ ধরা হচ্ছে কিন্তু কাউকেই পুকুরে নেমে শরীর ভেজাতে হচ্ছে না। শীতের কাপড়ে মুড়িয়ে সবাই মাছ ধরার কাজ করছে। দেখে অবাক হতে হয়। বলা হচ্ছে সময় এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের। প্রযুক্তির উৎকর্ষে উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এ শতাব্দীতে কৃষিশিল্প হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইন্টারনেট অব থিংস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাযুক্ত প্রযুক্তির পাশাপাশি স্বল্পপরিসরে অল্প খরচে বেশি উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে সবাই। বিশেষ করে কৃষিশিল্পে সাধিত হচ্ছে যুগান্তকারী পরিবর্তন; যা বছর পাঁচেক আগেও কল্পনা করা যেত না, এমন প্রযুক্তির বাস্তবিক প্রয়োগ বিস্ময়করভাবে সফলতার বার্তা দিচ্ছে। প্রযুক্তির প্রভাবেই উন্নত দেশগুলোর উন্নত প্রযুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে। ফলে আমাদের দেশের মফস্বলের শিক্ষিত উদ্যোগী তরুণটিও ইন্টারনেটের মাধ্যমে পেয়ে যাচ্ছে সর্বশেষ খবর। বলা চলে, কৃষি প্রযুক্তি যেন প্রতিনিয়ত উদ্যোগী খামারিদের দুয়ারে কড়া নাড়ছে। নতুন উদ্যোগ গ্রহণের যথেষ্ট সাহস এখন আমাদের উদ্যোক্তাদের। আর এদের সাহসের ফলই আমাদের কৃষি সফলতা। ফল-ফসল থেকে শুরু করে পোলট্রি, ডেইরি, মৎস্য... কৃষির সব খাতই প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পাল্টে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মাছ চাষে তরুণদের আগ্রহ নতুন রুপালি বিপ্লবের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। গত শতাব্দীর আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে হাকিম আলী নামের একটি চরিত্র সৃষ্টি করে মাছ চাষে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধ করেছিলাম। নানা আকর্ষণীয় দৃশ্য দেখিয়ে তাদের মাছ চাষে টানা হয়েছিল। ঠিক সেই সময় থেকে তিন যুগ পর আজ মাছ চাষে যে সাহসী উদ্যোগ ও সাফল্য দেখছি তা অত্যন্ত আশাজাগানিয়া। রি-সার্কুলেশন অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম অর্থাৎ আরএএস বা রাস ও বায়োফ্লক পদ্ধতিতে ঘরের ভিতর, বাড়ির আঙিনায় অধিক ঘনত্বের মাছ চাষের বিষয়টি ইতিমধ্যে মোটামুটি সবাই জেনে গেছেন। প্রতিদিনই প্রযুক্তি এগিয়ে যাচ্ছে আরও দ্রুতগতিতে। অন্যদিকে বলা যায় আমাদের মৎস্যশিল্পে বিগত সময়ের প্রধান সমস্যাগুলোর কথা; যা মাছ চাষিদের কাছ থেকে বারবার উঠে এসেছে। অ্যামোনিয়া বা মাছের বর্জ্য মাছ চাষের প্রধান অন্তরায়। পুকুরের পানিতে মাছের বর্জ্য ও খাদ্যের অবশিষ্টাংশ মিশে পানি ও মাটি দূষিত করে ফেলে। ফলে কয়েক বছরের মাথায় মাছের উৎপাদন কমে যায়। মাছ চাষের অঞ্চলগুলোর অধিবাসীরা এ সমস্যার কথা বলে আসছেন দীর্ঘদিন ধরেই। মাছ চাষে প্রধান অন্তরায় হচ্ছে পুকুর বা জলাশয়ের পানিতে মাছের বর্জ্য অ্যামোনিয়ার আধিক্য ও অক্সিজেনের অভাব। কোনোভাবে যদি পানি থেকে অ্যামোনিয়া বর্জ্য সরিয়ে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া যায় তবে অধিক ঘনত্বেও মাছ চাষ সম্ভব। রেসওয়ে বটম ক্লিন পদ্ধতি হচ্ছে পানিতে প্রবাহ তৈরি করে জলাশয়ের বর্জ্যটিকে তলানিতে নিয়ে গিয়ে অপসারণ করা। আরও সহজভাবে বলতে গেলে বলা যায় দৌড় প্রতিযোগিতায় গোল যে পথ তৈরি করা হয় সেটাকে বলা হয় রেসওয়ে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আকবর হোসেন মাছ চাষে নিয়ে এসেছেন নতুন প্রযুক্তি। ইনপন্ড রেসওয়ে সিস্টেম। যার ফলে কম জায়গায় অধিক মাছ চাষ করে গুনছেন অধিক লাভ। 
পাঠক, আপনাদের মনে থাকতে পারে, ২০১৭ সালের নভেম্বরে আমি আকবর হোসেনের মাছের খামার ঘুরে এসে তা নিয়ে লিখেছিলাম। বিস্মিত হয়েছিলাম বরেন্দ্রর পাল্টে যাওয়া কৃষি উদ্যোগ দেখে। সে সময় আকবর হোসেন বলেছিলেন, তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাটি ও মানুষ এবং চ্যানেল আইয়ের ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠান দেখেই উদ্বুদ্ধ হন কৃষি অনুশীলনে। অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য ঘুরেছেন দেশ-বিদেশের খামারে। সাফল্যের চূড়ায় উঠতে যা যা প্রয়োজন তার সবটাই ঢেলে ২০ হেক্টর জায়গার ওপর ৩৬টি পুকুর নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন মাছের বিশাল খামার। শুধু মাছই নয়, খামারে রোপণ করেছিলেন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গাছ-গাছালি। পুকুরের পাড়ে মাল্টা গাছ রোপণ করেছেন ৪০০টি। ভিয়েতনামের নারিকেল চারা লাগিয়েছেন ৫০০টি। আছে ৬০০ ড্রাগন ফলের গাছ আর বিভিন্ন জাতের সারি বাঁধা পেঁপে গাছ। খামারটির এক পাশে প্রচুর কলাগাছ লাগিয়েছেন তিনি। প্রতি বছর শুধু কলা বিক্রি করেন ২ লাখ টাকার। খামারের সঙ্গে পাশেই রয়েছে আকবর হোসেনের নিজস্ব ফিডমিল। ফিডমিলের পাশে সুন্দর এক কবুতরের খামার। ২০১৭ সালেই তার কৃষি খামার দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। কারণ, মাছ চাষের ক্ষেত্রে অনেক নতুন অনুশীলন শুরু করেছিলেন তিনি। সব পুকুরে মাছের পর্যাপ্ত অক্সিজেন জোগান দেওয়ার জন্য ব্যবহার করেছিলেন অ্যারেটার। মাছের খাদ্য দেওয়ার বেলায় ম্যানুয়াল পদ্ধতি নয়, রয়েছে অটোফিডার। ফলে খাবারের অপচয় যেমন রোধ হয় তেমনি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবার দেওয়াটাও নিশ্চিত হচ্ছে। এবারও আকবর হোসেনের খামারে গিয়ে নতুনভাবে বিস্মিত হলাম। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছ চাষে বিপ্লব ঘটিয়েছেন আকবর হোসেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বুলনপুরে বিশাল খামারটিতে যুক্ত করেছেন ইনপন্ড রেসওয়ে সিস্টেম বা আইপিআরএস। আমার জানা মতে, আইপিআরএস পদ্ধতিতে মাছের খামার দেশে এটাই প্রথম। দক্ষিণ এশিয়ায় এ প্রযুক্তিতে ভারতে দুটি ও পাকিস্তানে তিনটি খামার রয়েছে। আকৃতিগত হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ায় আকবর হোসেনের খামারটি সবচেয়ে বড়। আইপিআরএস মূলত আমেরিকান প্রযুক্তি। চীন সেই প্রযুক্তিটিকে কাজে লাগিয়ে গত কয়েক বছরে মাছ চাষে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। এ পদ্ধতিতে মাছ চাষের বিশেষত্ব  হলো- কম জলাশয়ে মানসম্মত অধিক পরিমাণ মাছ উৎপাদন করা যায়। আকবর হোসেনের ‘নবাব হাইটেক মৎস্য খামার’ ঘুরে দেখলাম। এই কয়েক বছরে আকার আয়তনে আরও বড় হয়ে উঠেছে খামার। আগে পুকুর ছিল ৩৬টি। এখন ৪২টি। বিশাল খামারের ৬০ বিঘার একটি পুকুরে তৈরি করা হয়েছে কংক্রিটের ১৩টি চ্যানেল। সেখানে পাইপলাইনে সংযুক্ত রেসওয়ে প্রযুক্তির মাধ্যমে চ্যানেলগুলোয় কৃত্রিম গ্রোত তৈরি করা হচ্ছে। এতে প্রবহমান পানিতে সব সময়ই তৈরি হচ্ছে অক্সিজেন। চ্যানেলের মাছগুলো পাচ্ছে নদীর গ্রোত ও পরিবেশ। ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে ছয় গুণ বেশি মাছ বসবাস করতে পারছে। একেকটি চ্যানেলে রয়েছে একেক ধরনের মাছ। আকবর হোসেন জানালেন, প্রযুক্তির সাহায্যে খাবার সরবরাহ ও সুষ্ঠুভাবে পরিচর্যা হওয়ায় মাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং নেই রোগবালাইয়ের প্রকোপ। যন্ত্রের সাহায্যে পানি থেকে মাছের বর্জ্য ও অবশিষ্ট খাদ্যাংশ ছেঁকে আলাদা করে তা থেকে তৈরি করা হয় জৈব সার। যা ব্যবহার করা হচ্ছে পুকুর পাড়ের সবজি চাষে। মাছ চাষের প্রতিটি স্তর এতটাই স্বচ্ছ ও বিশুদ্ধ যে, মাছের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। মাছ দেখতে যেমন নদীর মাছের মতো জীবন্ত, স্বাদ-গন্ধেও অতুলনীয়। 
চ্যানেলের পাকা ধার ধরে হাঁটতে হাঁটতে কথা হচ্ছিল আকবর হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, ব্যবসার কাজে চীনে গিয়ে আইপিআরএস প্রযুক্তি দেখে তিনি উদ্বুদ্ধ হন। তারপর দেশে ফিরে এ প্রযুক্তিতে মৎস্য খামার গড়ে তোলেন। গত বছরের প্রথমদিকে চীন থেকে আইপিআরএস প্রযুক্তি আমদানি করেন। চীনা প্রযুক্তিবিদ ও প্রকৌশলীরা সব যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম স্থাপন করে দিয়ে যান। খামারে এ প্রযুক্তির জন্য বিনিয়োগ ৫ কোটি টাকার বেশি। গত বছরের প্রথম থেকেই আইপিআরএস পদ্ধতিতে মাছ চাষ শুরু করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু করোনার অভিঘাত কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছে। তিনি বলছিলেন, ৬০০ বিঘা জলাশয়ে যে পরিমাণ মাছ উৎপাদন সম্ভব, আইপিআরএস প্রযুক্তিতে ৬০ বিঘার খামারে সেই পরিমাণ মাছ উৎপাদন হবে। একেকটি চ্যানেল থেকে বছরে তিনবার মাছ উৎপাদন সম্ভব। অর্থাৎ বছরে তিনটি মৌসুমে মাছ চাষ করা যাবে অনায়াসে। তিনি বছরে দুই মৌসুম ধরে হিসাব করে দেখেছেন, ৬০ বিঘা জলাশয় থেকে ২ হাজার টন মাছ পাবেন। যার বাজার মূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রথম বছরেই বিনিয়োগ উঠিয়ে সমপরিমাণ লাভের আশা করছেন। খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি আমাদের এখন ভাবতে হচ্ছে নিরাপদ খাদ্যের বিষয়েও। সে প্রশ্নে প্রযুক্তির কৃষির বিকল্প নেই। আমরা দেখেছি গত কয়েক দশকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফসলি জমি কেটে পুকুর বানিয়ে মাছ চাষের একটা প্রবণতা। এতে আমরা মাছ চাষে এগিয়েছি, কিন্তু কৃষি ফসল উৎপাদনের জমি হারিয়ে ফেলছি। সে ক্ষেত্রে যদি আইপিআরএস প্রযুক্তিতে খামার গড়ে তোলা হয় তাহলে কম জায়গাতেই বেশি মাছ পাওয়া যাবে। এতে ফসলি জমি নষ্ট করে হাজার হাজার পুকুর তৈরির দরকার পড়বে না। মৎস্য খাতকে আরও লাভজনক করতে সরকারের উচিত হবে মাছ রপ্তানিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। ভিয়েতনাম, মিয়ানমারের মতো আমরাও মাছ রপ্তানি করে আয় করতে পারি বৈদেশিক মুদ্রা। ১৯৯০-৯৫ সালেও ভারত ও ভিয়েতনাম থেকে কোটি কোটি টাকার রুই-কাতলা মাছ আমদানি করতে হয়েছে আমাদের। এখন আর প্রয়োজন পড়ছে না। আমরা দেশে মাছের চাহিদা পূরণে সফল হয়েছি। বিদেশে মানসম্পন্ন মাছের বাজার ধরতে পুরোপুরি প্রস্তুত আকবর হোসেনের মতো মাছ চাষিরা। এখন সরকারি-বেসরকারি সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাছের আন্তর্জাতিক বাজারে ঠাঁই করে নেওয়াটাই হবে মাছ  চাষের নতুন বিপ্লবের প্রথম ধাপ। 
 

You May Also Like