উত্তরের দিনাজপুরসহ পাঁচ জেলায় চা পাতা উত্তোলনের নতুন মৌসুম

সামসউদ্দীন চৌধুরী কালাম ॥ 

গত বছর রেকর্ড পরিমাণ চা উৎপাদনের পর পঞ্চগড়সহ উত্তরের কয়েকটি জেলার সমতল ভূমির চা-বাগান থেকে পাতা উত্তোলনের নতুন মৌসুম শুরু হয়েছে। শীতের কারণে প্রায় দুই মাস পর এরই মধ্যে চাগাছ থেকে শুরু হয়েছে নতুন পাতা তোলার কাজ। আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে চা-বাগানগুলো। প্রতি বছর ডিসেম্বরের শেষদিকে চাপাতা সরবরাহ না থাকায় বন্ধ হয়ে যায় চা-কারখানাগুলো। প্রায় দুই মাস পর আবারও উৎপাদন শুরু হয়েছে চা-কারখানাগুলোতে। তবে পুরো মৌসুম শুরু হতে চা-কারখানাগুলোকে অপেক্ষা করতে হবে পুরো মার্চ মাস পর্যন্ত। চলতি বছর পঞ্চগড়সহ পার্শ্ববর্তী পাঁচ জেলা থেকে এক কোটি ২০ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে চা বোর্ড। তাদের আশা পুরনো বাগান ছাড়াও নতুন বাগান থেকে পাতা তোলা শুরু হওয়ায় এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আরও বেশি চা উৎপাদন হতে পারে। এ দিকে চা চাষিদের দীর্ঘদিনের দাবি, পঞ্চগড়ে চায়ের অকশন মার্কেট বা নিলাম বাজার চালু করা। উত্তরের জেলাগুলোর উৎপাদিত চা চট্টগ্রাম ও শ্রীমঙ্গলে নিতে পরিবহণ খরচ বেশি হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চা চাষিরা। তাদের দাবি চলতি বছরই যেন পঞ্চগড়ে দেশের তৃতীয় অকশন মার্কেট বা নিলাম বাজার করা হয়। এতে করে তারা তাদের উৎপাদিত সবুজ কাঁচা পাতার ন্যায্যমূল্য পাবেন। পঞ্চগড় আঞ্চলিক চা বোর্ড অফিস সূত্রে জানা গেছে, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও নীলফামারী জেলায় ১০ হাজার ১৭০ একর জমিতে চা চাষ করা হয়েছে। গত বছর এসব জমি থেকে ৯৫ লাখ কেজি তৈরি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে গত বছর পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ের চলমান ১৮টি চা কারখানায় সরবরাহ করা হয়েছিল পাঁচ কোটি ১২ লাখ ৮৩ হাজার ৩৮৬ কেজি সবুজ পাতা। এসব সবুজ পাতা থেকে লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে রেকর্ড পরিমাণ এক কোটি ৩ লাখ কেজি চা উৎপাদন করেছিল চা কারখানাগুলো। চলতি বছর চায়ের জমির পরিমাণ আরও বেড়েছে। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি চা আবাদ হয়েছে পঞ্চগড়ে। জেলার পাঁচ উপজেলায় বর্তমান পর্যন্ত চা আবাদ রয়েছে ৮ হাজার ৬৪২ একর জমিতে। চলতি বছর চা আবাদি জমির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় চা উৎপাদনও বেড়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন চা বোর্ডের কর্মকর্তারা। পঞ্চগড় সদরের স্যালিলান টি এস্টেটের ম্যানেজার মো. আব্দুস সালাম বলেন, 'চা উৎপাদন মৌসুম শুরু হয়েছে। কাঁচা চা পাতার ওপর নির্ভর করে চা কারখানা চালু করা হয়ে থাকে। আমরা গত এক সপ্তাহ ধরে কাঁচা চা পাতা সংগ্রহ করছি। আনুষ্ঠানিকভাবে গত সোমবার থেকে কারখানা চালু করলাম।' তিনি জানান, মধ্য মার্চ থেকে অধিকাংশ চা কারখানায় চা উৎপাদন শুরু হবে। বাংলাদেশ স্মল টি গার্ডেন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমিরুল হক খোকন বলেন, 'পঞ্চগড়ে প্রতি বছর চা চাষ ও চায়ের উৎপাদন বাড়ছে। চায়ের গুণগতমানও বৃদ্ধি পেয়েছে। পঞ্চগড়ে চায়ের নিলাম বাজার স্থাপন করা হলে চাচাষিরা উপকৃত হবে। আমাদের দাবি চলতি বছরেই যেন পঞ্চগড়ের দেশের তৃতীয় অকশন মার্কেট বা নিলাম বাজার করা হয়।' পঞ্চগড়স্থ বাংলাদেশ চা বোর্ড আঞ্চলিক কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও নর্দান বাংলাদেশ প্রকল্পের পরিচালক ড. মোহাম্মদ শামীম আল মামুন বলেন, 'প্রতি বছর পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় চা আবাদি জমির পরিমাণ বাড়ছে। ২০১৯ সালে এই অঞ্চলে ৮ হাজার ৬শ ৮০ একর জমিতে চা আবাদ করা হয়েছিল। গত বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ১৭০ একর জমি। এবারও গত বছরের চেয়ে চা আবাদি জমির পরিমাণ বাড়বে।' তিনি আরও জানান, পঞ্চগড়সহ উঞ্চরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় 'ক্যামেলিয়া খোলা আকাশ স্কুল' চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে চা আবাদ বিষয়ে চাষিদের মাঠে গিয়ে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া স্বল্পমূল্যে উন্নত জাতের চারা ও আধুনিক প্রযুক্তি সরবরাহ করে চা চাষ সম্প্রসারণের জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। চা চাষিদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সমাধান দিতে ইতোমধ্যে 'দুটি পাতা একটি কুঁড়ি' নামে একটি মোবাইল অ্যাপস চালুসহ পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ে পেস্ট ম্যানেজমেন্ট ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে। এখান থেকে চা চাষিদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান, চাষের নানান রোগবালাই ও পোকা দমনে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

You May Also Like