দক্ষিণাঞ্চলে মাছ চাষে নতুন সম্ভাবনা

বরিশাল থেকে সংবাদদাতা ॥ 

বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় মাছ চাষে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে 'কার্প ফ্যাটেনিং' প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তির আওতায় রুই, কাতলা, মৃগেল ও সিলভার কার্প; দেশি জাতের শিং, মাগুর ও গলসা মাছ চাষ করে স্বল্প ব্যয় এবং সময়ে বেশি লাভবান হতে পারবেন চাষিরা। সংশ্নিষ্টরা মনে করছেন, দক্ষিণাঞ্চলসহ সারাদেশে আমিষের চাহিদা মেটাতে মৎস্য উৎপাদনে আশার আলো দেখাচ্ছে এ প্রযুক্তি। 
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল আলম পবিপ্রবির কয়েক শিক্ষার্থীকে নিয়ে ৩ বছর ধরে গবেষণা চালিয়ে এ প্রযুক্তিতে সফল হয়েছেন। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ, আনিপাড়া ও কাঁঠালপাড়া গ্রামের ৩০টি প্রদর্শনী পুকুরে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে তারা এ গবেষণা শুরু করেছিলেন। এ কার্যক্রমে আর্থিক সহযোগিতা দিচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রোগ্রাম প্রকল্প-২ (এমএটিপি-২)। গবেষক ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের মাছ চাষিরা সাধারণত হ্যাচারি থেকে রেণু পোনা সংগ্রহ করে কার্প জাতীয় মাছের পোনা পুকুর বা জলাশয়ে চাষ করেন। এ ধরনের ছোট মাছের পোনা বড় হতে বা খাওয়ার ও বাজারজাত করার উপযোগী হতে ২-৩ বছর সময় লাগে। তা ছাড়া ছোট সাইজের মাছের পোনার মৃত্যুহারও বেশি। এতে মাছ চাষিরা ততটা লাভবান হতে পারেন না। কিন্তু গবেষণালব্ধ 'কার্প ফ্যাটেনিং' প্রযুক্তিতে ৫০০-৬০০ গ্রাম ওজনের কার্প জাতীয় মাছের পোনা পুকুর বা জলাশয়ে চাষ করলে তাতে দ্রুত লাভবান হওয়া যায়। চাষ করা পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্যের পাশাপাশি কিছু সম্পূরক খাদ্যও দিতে হবে। প্রতি শতাংশে সর্বোচ্চ ১৫টি মাছ ছাড়তে হবে। এভাবে চাষ করলে ৬-৭ মাসের মধ্যে ওই মাছ ২-৩ কেজি ওজনের হবে। অর্থাৎ ২-৩ বছরের পরিবর্তে ৬-৭ মাসের মাথায় চাষি মাছ বাজারজাত করতে পারবেন। এ প্রযুক্তিতে মাছ কম মারা যায়। ফলে সবদিক দিয়েই চাষি খুব তাড়াতাড়ি লাভবান হন। 
ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, এ ধরনের প্রযুক্তির সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্য চাষিরা পরিচিত ছিলেন না। গত ৩ বছর ধরে কলাপাড়ার তিন গ্রামে ৩০ জন চাষিকে নির্বাচিত করে তাদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে 'কার্প ফ্যাটেনিং' প্রযুক্তিতে মাছ চাষ করানো হয়েছে।  
ওই চাষিরা উৎপাদনে পুরোপুরি সফল হয়েছেন। তারা স্বল্প সময়ে অধিক মাছ উৎপাদন করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। ড. আবদুর রাজ্জাক আরও জানান, উপকূলীয় এলাকায় এ প্রযুক্তি মাছ চাষিদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। কার্প ফ্যাটেনিং প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রকল্প এলাকায় গ্রামীণ নারীদের সম্পৃক্ত করে ছোট ছোট জলাশয়ে দেশি জাতের শিং, মাগুর ও গলসা মাছ চাষ করেও সফলতা এসেছে। উপকূলীয় এলাকায় দেশি জাতের ওই তিন প্রকার মাছের মধ্যে মাগুর খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে চাষিদের মধ্যে দেশি ওই ৩ জাতের মাছ চাষে গভীর আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। উপকূলীয় মাছ চাষিদের মধ্যে এ প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে ৬০ জন মাছ চাষিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওই প্রশিক্ষণে বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অংশ নেবেন। প্রযুক্তির ধারণা দিতে এবং সুবিধা বর্ণনা করে মাছ চাষিদের মধ্যে প্রচারপত্রও বিলি করা হবে। 
গবেষণা প্রকল্পের সুবিধাভোগী কলাপাড়ার নীলগঞ্জ গ্রামের মাছ চাষি মিলন খলিফা বলেন, কার্প ফ্যাটেনিং প্রযুক্তি উপকূলীয় মাছ চাষিদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। এ প্রযুক্তিতে মাছ চাষ করে তারা বেশ লাভবান হচ্ছেন। স্থানীয় মাছ চাষিরা এখন এ প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছেন। অপর এক সুবিধাভোগী আনিপাড়া গ্রামের শামীম মাতুব্বর জানান, কার্প ও দেশীয় জাতের মাছ চাষে নতুন প্রযুক্তি তাদের জন্য বড় সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। এ প্রযুক্তিতে মাছ চাষ করে তারা অর্থনৈতিকভাবে অধিক লাভবান হবেন। 
গবেষক ড. মো. আরিফুল আলম বলেন, কার্প ফ্যাটেনিং প্রযুক্তির মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় কার্প জাতীয় মাছ চাষে বিপ্লব ঘটবে। এতে প্রান্তিক চাষিদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে। 
 

You May Also Like