স্বপ্ন অনেক, বাস্তবায়ন কতদুর? ঢাকা ও রংপুর চিড়িয়াখানার উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা

মোহাম্মদ নুরুজ্জামান ॥ 

স্বপ্ন যার নেই, পরিকল্পনাও তার মধ্যে নেই, স্বপ্ন দেখতে হবে। স্বপ্নের মধ্যেই একসময় বাস্তবতার দেখা মেলে। স্বপ্নবিহীন নিরলস জীবনের কোনো মূল্যই নেই। হ্যা বলছিলাম জাতীয় চিড়িয়াখানার প্রসঙ্গে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং চিড়িয়াখানার কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের বলেছেন, ঢাকার জাতীয় চিড়িয়াখানা ও রংপুর চিড়িয়াখানাকে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকয়ন করা হচ্ছে। আর এজন্য এই দুই চিড়িয়াখানাকে ঘিরে এক মহা-পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হচ্ছে। Once Upon a time সম্ভবত খোকাবাবু তখন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। প্রাণিসম্পদ মেলাসহ কয়েকটি বড়বড় প্রোগ্রামে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। ফাঁক ফিঁকিরে একবার আমি মন্ত্রী মহোদ্বয়কে বলেছিলাম চিড়িয়াখানার দুদর্শা এবং দুর্নীতির বিষয়। তিনি সরাসরি আমার কাছ থেকে এমন প্রশ্ন শুনে বিব্রতবোধ করছিলেন। ঝানু Politician ঠান্ডা মাথায় ঠিক এরকমই চিড়িয়াখানা নিয়ে মহা-পরিকল্পনার স্বপ্নের কথা শুনালেন এবং বাস্তবায়নের কাজ শ্রিঘ্রই শুরু হবে বলে জানালেন। 


এরপর আমি আসম আব্দুর রব এর কাছে। তিনি এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালীন চিড়িয়াখানার সম্পর্কে একই ধরণের প্রশ্ন করেছিলাম। প্রথমে রেগে গেলেও পরে আমাকে চিড়িয়াখানার ভবিষ্যৎ কল্পকাহিনী শুনিয়ে আমাকে আস্বস্থ্য করেন। যাকগে সে সব কথা, পরে যা জেনেছিলাম, আসম আব্দুর রব নিজ বাড়ীতেই একটি মিনি চিড়িয়াখানা করেছিলেন আমাদের জাতীয় প্রাণিসম্পদকে নিয়ে। অবশ্য আসম আব্দুর রবের পূর্বে বাবু সতীশ চন্দ্র রায় এই সেক্টর এবং মন্ত্রণালয়কে নিয়ে এগুছিলেন। কিন্তু উনি সময় পাননি। 


পরবর্তী আব্দুল লতীফ বিশ্বাসের কথা বা তার পরিকল্পনার কথা নাই বা বললাম। তবে তার আমলে শতশত কোটি টাকার বেশ মূল্যবান কিছু প্রাণি ক্রয় করা হয়েছিল কয়েক ধাপে। কিন্তু বাস্তবে সেসব প্রাণি বেঁচে আছে না মরে গেছে আদৌ ক্রয় করা হয়েছিল কিনা এর উত্তর চিড়িয়াখার কর্তৃপক্ষই দিতে পারবে এখন। 


আমরা জাতীরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চলমান জন্মশত বার্ষিকীতে জাতীয় চিড়িয়াখানার উন্নয়নে এ মহা-পরিকল্পনার যে স্বপ্ন এবং পরিকল্পনার কথা ভাবছি তা এবার দেশবাসিকে নিরাস বা হতাশা করবে না বলে মনে প্রাণে বিশ্বাস করি। টেলিভিশন কিংবা বইয়ের পাতায় স্থান পাওয়া জীবজন্তদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ মেলে ঘনজঙ্গল বেষ্টিত চিড়িয়াখানায়। ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় চিড়িয়াখানার ১৮৬ দশমিক ৬৩ একর জমিতে বাঘ, ভাল্লুক, হরিণ, অজগরসহ প্রায় তিন হাজার প্রাণীর বাস। দীর্ঘদিন চিড়িয়াখানায় কোনো নতুনত্ব না থাকায় দর্শক হারাচ্ছে বিনোদন কেন্দ্রটি। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সিঙ্গাপুরের চিড়িয়াখানার আদলে জাতয়ি চিড়িয়াখানাকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। ইতিহাস ঘেটে জানা যায়, উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ঢাকার শাহবাগে তৎকালীন নবাবরা একটি ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানার গোড়াপত্তন করেছিলেন। পঞ্চাশের দশকের শেষে সুপ্রিম কোর্টের সামনে বর্তমান জাতীয় ঈদগাহ এলাকায় চার থেকে পাঁচ একর জায়গাজুড়ে ছোট আকারের একটি চিড়িয়াখানা স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে স্বাধীনতার পরে ১৯৭৪ সালে বর্তমান অবস্থানে চিড়িয়াখানাটি স্থানান্তরিত হয়। ওই বছরের ২৩ জুন চিড়িয়াখানাটি উদ্বোধন ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। 


চিড়িয়াখানা ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৪৭ বছর পর চিড়িয়াখানার উন্নয়নে ১৫ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের চলমান জন্মশত বার্ষিকীতে শুরু হতে পারে চিড়িয়াখানার আধুনিকায়নের কাজ। এ বছরের জুনেই মহাপরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করবে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। সিঙ্গাপুরের বিখ্যাত চিড়িয়াখানা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বারনার্ড হ্যারিসন অ্যান্ড ফ্রেন্ডস লিমিটেড চিড়িয়ানার আধুনিকায়নের কাজ করতে আগ্রহী। জানা গেছে, আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঢাকা ও রংপুরের চিড়িয়াখানার আধুনিকায়ন করতে চায় অধিদফতর। কয়েক বছর আগে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দুই চিড়িয়াখানার উন্নয়নের পরিকল্পনা ছিল। তবে অনিয়ম, আধুনিকায়নের রূপরেখা তৈরির জন্য যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় সেখান থেকে সরে আসে অধিদফতর। তবে পুনরায় চিড়িয়াখানা দুটির আধুনিকায়ন প্রকল্পে নজর দিয়েছে অধিদপ্তর। চিড়িয়াখানা সূত্রে জানা গেছে, মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী চিড়িয়াখানার ডিজিটাল ম্যাপ ও লে আউট প্ল্যান করা হয়েছে। ইনসেপশন ও ইন্টারিং রিপোর্ট করা হয়েছে। ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান ডকুমেন্টস তৈরিসহ বাকী কাজ আগামী জুনের মধ্যেই মাস্টারপ্ল্যান হচ্ছে। এ বছরের জুনের মধ্যে এই প্ল্যান শেষ হবে। প্ল্যান অনুযায়ী ঢাকা ও রংপুর চিড়িয়াখানার আধুনিকায়ন করা হবে। তিনি বলেন, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের জাতীয় চিড়িয়াখানাকেও আধুনিকায়ন করতে চাই। কোনো ডেভেলপমেন্ট যদি আমরা করতে চাই তখন মাস্টারপ্ল্যানের প্রয়োজন। মাস্টারপ্ল্যান চারটি ধাপ। এখন আমরা মাত্র দুটি ধাপ সম্পন্ন করছি। আমরা ইনসেপশন ও ইন্টারিং রিপোর্ট করেছি। এখন ড্রাফট ও ডিপিডি তৈরি বাকী। এর মধ্যে আমরা ডিজিটাল ম্যাপ পেয়েছি, লে আউট প্ল্যান পেয়েছি। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত এখানে উঠে এসেছে। এটা ফাইনাল হলে ডিজিটাল ড্রাফট করা হবে। 


পাঁচটি জোনে বিভক্ত হচ্ছে চিড়িয়াখানা:  আফ্রিকা অঞ্চলের প্রাণী, বাংলাদেশি প্রাণি, গৃহপালিত প্রাণী, অন্যান্য প্রাণী ও নাইট সাফারি এই পাঁচ জোনে বিভক্ত হচ্ছে চিড়িয়াখানা। সিঙ্গাপুরের চিড়িয়াখানার আদলে হবে নাইট সাফারি। সেখানে পড়ন্ত বিকেলে কিংবা রাতের রঙিন আলোয় বিভিন্ন অ্যাক্রোবেট দেখবেন দর্শকরা। এছাড়া রাতেও প্রাণীদের দেখতে পারবেন তারা। এর ফলে চিড়িয়াখানা শুধুমাত্র দিনের বিনোদন কেন্দ্র হবে না। দিন ও রাত দুই বেলায় চিড়িয়াখানায় বিনোদন নিতে পারবেন দর্শনার্থীরা। এ ছাড়া নতুন নতুন আরো প্রজাতির প্রাণী আনা হবে। সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য অ্যাকুরিয়াম স্থাপন করা হবে। কিউরেটর আবদুল লতিফ বলেন, পুরো চিড়িয়াখানাকে মাস্টারপ্ল্যানে পাঁচ জোনে ভাগ কর হয়েছে। জোনগুলো হয়তো একবারে বাস্তবায়ন হবে না। আমরা সুপারিশ করেছি তিন বছরে একটা জোন যেন করতে পারি। অন্তত ১৫ বছরে হলেও এটা বাস্তবায়ন হবে। প্রথম ধাপে আমরা বাংলাদেশি বা সুন্দরবন ভিত্তিক প্রাণী ও আফ্রিকা অঞ্চলের প্রাণী নিয়ে কাজ করবো। আমাদের অ্যাডমিস্ট্রেটিভ ভবন নির্মাণ প্রথম ধাপে করার পরিকল্পনা আছে। 


চিড়িযাখানার লেকে বার্ড শো, ডলফিন শো:  প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ আছে জাতীয় চিড়িয়াখানার পশ্চিমপাশের লেকে অবস্থিত পিকনিক স্পট-উৎসব দ্বীপ ও নিঝুম দ্বীপ। কারণ হিসেবে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলেন, পিকনিক স্পট ব্যবহারে গুচ্ছ দর্শনার্থী কিংবা শুটিং গ্রুপগুলো নিয়ম মানে না। ফলে গত বছরের শুরু থেকেই বন্ধ এই দুটি স্পট। তবে এবার সেই লেক আধুনিকায়নের চিন্তা করছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। লেকগুলো ব্যবহার করে সেখানে রোকওয়ে, বার্ড শো ও ডলফিন শো করার কথা পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। লেকে প্যাডেল সিস্টেম নৌকার ব্যবস্থাও রাখার প্রস্তাব পরিকল্পনায় আছে বলে জানা গেছে। 


ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য ভাসম্যান রেস্তোরা, ট্রাভেলকার :  নতুন দিনের দর্শকদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে মুভ অ্যাবল বা ভাসমান রেস্তোরার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে নতুন পরিকল্পনায়। এ ছাড়া শিশুদের জন্য মিনি পার্কের ব্যবস্থা থাকবে। শিশু পার্কে ইলেকট্রিক ট্রেন, মেরি গো রাউন্ড, ম্যাজিকশোসহ আরো কয়েকটি আইটেম থাকবে। আর মুজিববর্ষ শেষ হওয়ার আগেই প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধ বা পাঁচ থেকে ছয় সদস্যের পরিবার যেন পুরো চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখতে পারে সেজন্য ট্রাভেলকার সংযুক্তি হচ্ছে। 


আমরা চিড়িয়াখানার আধুনিকায়নে যে সমস্ত পরিকল্পনার কথা জানলাম শুনলাম। তা সত্যিই এদেশের চিড়িয়াখানার জন্য একটি স্বপ্ন বটে। আমাদের প্রত্যাশা আমরা এবং আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম নতুন ও আধুনিক ডিজিটাল চিড়িয়াখানার সংগে মিলিত হবে-ইনশাআল্লাহ। 
 

You May Also Like