সম্ভাবনার ট্রাম্পকার্ড প্রাণিসম্পদ খাত

মো. হাছিবুল বাসার মানিক //

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ খাত প্রাণিসম্পদ। সুস্থ সবল ও বিকশিত জাতি গঠনে প্রাণিজ আমিষের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের মোট চাহিদার ৮০ ভাগ পূরণ করে প্রাণিসম্পদ খাত। বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি নীরবে নিভৃতে অবদান রেখে চলেছে দেশের অর্থনীতির ভাগ্যোন্নয়ন। কিন্তু, বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় প্রাণিসম্পদ খাত বারংবার মুখ থুবড়ে পড়েছে পুরোনো আমলের জনবল কাঠামো ও দিকনির্দেশনার অভাবে। 

দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ ভাগ প্রত্যক্ষ ও ৫০ ভাগ মানুষ পরোক্ষভাবে প্রাণিসম্পদের সঙ্গে জড়িত। দেশের জিডিপিতে অবদান ১.৪৭ শতাংশ আর বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৩.৪৭ শতাংশ। টাকার অঙ্কে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা যুক্ত হয় অপার সম্ভাবনাময় এ খাত হতে। আশির দশক থেকে গুটি গুটি পায়ে বিস্তার লাভ করে বর্তমানে প্রায় ৫০-৬০ হাজার কোটি টাকার শিল্পে রূপ নিয়েছে পোলট্রি শিল্প, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় অর্ধকোটি মানুষ। প্রতি বছর পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে ৫০ লক্ষাধিক পশু হূষ্টপুষ্ট করে প্রস্তুত করা হয়, যেখানে জড়িয়ে থাকে হাজারো মানুষের কোটি কোটি টাকার স্বপ্ন। তাছাড়াও রয়েছে টার্কি, ছাগল, ভেড়া ও মহিষের খামার; যা মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি জিডিপিতে অনন্য অবদান রেখে চলেছে। দেশের আরেক রমরমা ব্যবসা খাবার হোটেল ও রেস্টুরেন্টের মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে প্রাণিসম্পদ খাতের উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে।  

সামান্য পরিসংখ্যানের হিসাবেই বুঝা যাচ্ছে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার অন্যতম মূল উপজীব্য হিসেবে কাজ করে চলেছে প্রাণিসম্পদ খাত। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দুধ, ডিম, মাংসের বাজার মাঝেমধ্যেই অস্থির হয়ে ওঠে। করোনাকালীন ক্রান্তিলগ্নে সঠিক দিকনির্দেশনা, উন্নত বিপণন ব্যবস্থা তৈরি, জনবল সংকট ও বাজার তদারকির অভাবে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন লাখ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারি। ৫.৫০ টাকা উৎপাদন খরচের ডিম বিক্রি হয়েছে তিন-চার টাকায়, ৭০-৮০ টাকা লিটার দুধ ৩০-৪০ টাকায়, ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ৭০-৮০ টাকায়। বিপিআইসিসির দেওয়া তথ্য মতে, লকডাউনের শুরু থেকে শুধু ২১ দিনেই পোলট্রি শিল্পে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। নষ্ট করতে হয়েছে হাজার হাজার এক দিন বয়সের মুরগির বাচ্চা। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লাম্ফি স্কিন ডিজিজ, জনবল সংকট হওয়ায় খামারিরা কোয়াকদের দ্বারস্থ হয়ে হাজার হাজার টাকা খোয়াচ্ছে। 

অপর দিকে, প্রায় ৮ কোটি মানুষ ও ১১ কোটি গবাদিপশু থাকাকালীন তৈরি হওয়া অর্গানোগ্রাম চার দশক পর বর্তমান ১৭ কোটি মানুষ আর ৪০ কোটি গবাদিপশুর কাছে অসহায়। বাকৃবি থেকে পাশ করে যখন ৫০ জন ভেট ডাক্তার বের হতো তখনকার জনবল কাঠামো বর্তমান ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজের প্রায় ১০০০ ছাত্রছাত্রীর কাছে অনেকটা নিঃস্ব স্বপ্নের মতো। 

বিপুল সম্ভাবনার প্রাণিসম্পদ খাতকে অতিদ্রুত আধুনিকায়ন করা এখন সময়ের দাবি। খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে অর্গানোগ্রাম বাস্তবায়ন করা হোক। সঠিক দিকনির্দেশনা, নেতৃত্ব, উন্নত বিপণন ব্যবস্থা তৈরি, বাজার তদারকি, ভেট ডাক্তারদের দ্বারা উৎপাদিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, খামারিদের দ্বারে দ্বারে চিকিৎসাসেবা পৌঁছানো নিশ্চিত করা, পশুখাদ্যের মূল্য নির্ধারণ, সংকটের মুহূর্তে প্রণোদনা প্রদান করতে পারলে গুরুত্বপূর্ণ এ খাত হতে পারে অর্থনীতির চাকা সচল রাখার অন্যতম ট্রাম্পকার্ড। 

লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 
 

You May Also Like