দেশের মাটিতেই আশা জাগাচ্ছে বিদেশি ফল

  • Posted on 17-11-2020 17:10:18
  • National

রোকন মাহমুদ ॥ 

দেশের মাটিতেই এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ করা হচ্ছে থাই পেয়ারা, মাল্টা, কমলা, থাই কুল, থাই পেঁপে, স্ট্রবেরি, ড্রাগন, মেলন, অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান এই ১০ রকম ফল। স্বাদ ও ফলন ভালো পাওয়ায় আমদানি করা ফলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বাজার দখল করে নিয়েছে এগুলো। আমদানি ও দেশে উৎপাদন মিলিয়ে এসব ফল পাওয়া যায় বারো মাস। দামও মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে। এ ছাড়া পার্সিমন, স্টার ফ্রুট, আঠাবিহীন লাল কাঁঠাল, খেজুর ও থাই শরিফার চাষ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। চার-পাঁচ বছরের মধ্যে এগুলো বাজারজাত করা সম্ভব হবে বলে কৃষিবিদরা জানিয়েছেন।  এ ছাড়া নাবি (দেরিতে আসে) ও বারোমাসি জাতের আম, লিচুসহ বিভিন্ন ফলের আবাদ হচ্ছে। উচ্চ ফলনশীল এসব ফল বাজারে বারোমাসি ফলের সংখ্যা আরো বাড়িয়ে তুলবে। একই সঙ্গে ফলের বাজারে বিদেশনির্ভরশীলতা কমবে ও সাশ্রয়ী মূল্যে ভোক্তা ফল খেতে পারবে। আমদানি নিভর্রতা কমে ফল উৎপাদনে স্বনির্ভর হবে দেশ। কৃষিবিদ ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সংরক্ষণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, আস্থার ঘাটতি, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রকল্প না থাকাসহ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, যেগুলো দূর করতে পারলে এসব ফলের উৎপাদন ও বাজার আরো বাড়ানো সম্ভব। এ ছাড়া উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য কিছু নীতিগত সহায়তাসহ প্রয়োজনে মূলধনের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রধান ও অপ্রধান মিলিয়ে ২৫-৩০ জাতের বিদেশি ফল আমদানি হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় খেজুর, আপেল, আঙুর, কমলা, মাল্টা, আনার ও নাশপাতি। বিশ্বের ৪৬টি দেশ থেকে ওই ছয়টি ফল আমদানি হয়। এর মধ্যে চীন, ব্রাজিল, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ভুটান, মিসর, দক্ষিণ আফ্রিকা অন্যতম। এসব ফলের মধ্যে এখন সবচেয়ে কম দামে পাওয়া যাচ্ছে সবুজ কমলা ও মাল্টা। বিক্রেতারা বলছেন, ভারত থেকে আমদানির পাশাপাশি দেশে উৎপাদিত সবুজ মাল্টা ও কমলাও বাজারে আসছে। একই কারণে ড্রাগন, স্ট্রবেরিসহ অনেক বিদেশি ফলের দাম মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে আসছে। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. আব্দুস সাত্তার মগুল বলেন, ‘দেশে আশাব্যঞ্জক হারে বিদেশি ফল উৎপাদন হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের সঙ্গে সঙ্গে আমদানি নিভর্রতাও কমছে। তবে এ খাতে উৎপাদন বাড়াতে এবং উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিতে কিছু নীতিগত সহায়তা দিতে হবে সরকারকে। এটা আমদানির ওপর শুল্ক বৃদ্ধি, মূলধন জোগানসহ বিভিন্নভাবে হতে পারে। এখনো ফল সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও প্যাকেজিং ব্যবস্থা আধুনিক হয়নি। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।’ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা যায়, সরকার ওই অধিদপ্তরের অধীনে ২০১৬ সালে ‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদন ও পুষ্টি উন্নয়ন’ নামের একটি প্রকল্প নেয়। প্রথমে ২০২১ সাল পর্যন্তমেয়াদের জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। চলতি বছর প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর ও বরাদ্দ ১০০ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. মেহেদি মাসুদ বলেন, ‘প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা ফলের ওপর গবেষণা করে সেগুলোকে বারো মাস উৎপাদনের উপযোগী করার চেষ্টা করছি। এগুলো আবাদের জন্য বিভিন্ন কৃষি গ্রুপকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, চারা বিতরণ করা এবং প্রদর্শনীর আয়োজনও করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় পরীক্ষামূলক আবাদ প্রকল্প ও হর্টিকালচার সেন্টার তৈরি করা হচ্ছে। আমরা এরই মধ্যে পেয়ারা, মাল্টাসহ কয়েকটি ফলের আবাদ সময় বাড়াতে পেরেছি। থাইল্যান্ডের বিভিন্ন আগাম জাতের আম ও লিচুর চারা আমরা বিতরণ করেছি। ফলন শুরু হলে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসেই আম ও লিচু পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।’ তিনি জানান, বিভিন্ন অঞ্চলে কিউজা আম, বেনানা ম্যাঙ্গো, সূর্যডিম আম ইত্যাদির ৫০ হাজার চারা বিতরণ করা হয়েছে। সেগুলো থেকে ডিসেম্বর মাসেও আম পাওয়া যাবে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশে বছরে ১২ শতাংশ হারে ফলের উৎপাদন বাড়ছে। আর বছরে ১০-১১ শতাংশ হারে বাড়ছে ফল চাষের জমি। ফল চাষের জমি বাড়ার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চারটি ফলের মোট উৎপাদনে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় উঠে এসেছে। কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বের দ্বিতীয়, আমে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম ও পেঁপেতে চতুর্দশতম স্থানে আছে বাংলাদেশ। আর মৌসুমি ফল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে দশম। কৃষি মন্ত্রণালয়ের গত বছরের হিসাব অনুযায়ী, এক যুগ আগেও দেশে ৫৬ জাতের ফলের চাষ হতো। বর্তমানে ৭২ জাতের ফল চাষ হচ্ছে। আরো ১২ জাতের ফল বাংলাদেশে চাষ উপযোগী করার জন্য গবেষণা চলছে। নতুন করে চাষ শুরু হওয়া ফলের মধ্যে ড্রাগনের ২৩টি প্রজাতি, খেজুরের ১৬টি, নারকেলের দুটি প্রজাতি, কাঁঠালের একটি, আমের তিনটি নতুন প্রজাতি চাষের প্রাথমিক সফলতা পাওয়া গেছে। ফলের এসব জাতের সবই থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। শুধু ফলের উৎপাদন বাড়ার দিক থেকে নয়, বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু ফল খাওয়ার পরিমাণও গত এক যুগে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০০৬ সালে বাংলাদেশের মানুষ গড়ে প্রতিদিন ৫৫ গ্রাম ফল খেত। ২০১৯ সালে তা ৮৫ গ্রামে উঠে এসেছে। আগে দেশে আম, কাঁঠাল, লিচু, জামসহ কিছু ফল মৌসুম অনুযায়ী খেতে পারত। এখন সারা বছর ২২ জাতের ফল নিয়মিত খেতে পারে। বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুট ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আপেল, আঙুর, নাশপাতি, আনারসহ হাতে গোনা কয়েকটি ফলের চাহিদা মেটাতে শতভাগ আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে আমাদের। বাকি প্রায় সব ফলই কিছু না কিছু উৎপাদন হচ্ছে। দিন দিন চাহিদাও বাড়ছে। এগুলোর আমদানিও কমেছে।’ 


চ্যালেঞ্জ : ডিএইর কৃষিবিদ নুরুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু ফলের ক্ষেত্রে দ্রুত হিমাগারে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয়। একই সঙ্গে সেগুলোর সরবরাহ করতে হয় নির্দিষ্ট তাপমাত্রার ভ্যানে করে। অন্যথায় সেগুলো পচে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে স্ট্রবেরি অন্যতম। আমাদের সে ব্যবস্থা নেই। এ ছাড়া দেশে উন্নত জাতের চারা উৎপাদন ও বিতরণের জন্য যে পরিমাণ হর্টিকালচার সেন্টার দরকার তাও নেই।’ তিনি জানান, দেশে বর্তমানে ৭৪টি হর্টিকালচার সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে কোনো জেলায় চারটি আছে আবার কোনো জেলায় একটিও নেই। দেশের ১৮টি জেলায় হর্টিকালচার সেন্টার নেই। 
কোন ফলের কী অবস্থা 


থাই পেয়ারা : একটা সময় পেয়ারা উৎপাদন হতো জুলাই-আগস্ট মাসে। অর্থাৎ বর্ষা মৌসুম পর্যন্তঅপেক্ষা করতে হতো ক্রেতাকে। কিন্তু এখন প্রায় বারো মাসই উৎপাদন হয়। চাহিদার ৭০ শতাংশই পূরণ হচ্ছে থাই পেয়ারায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, দেশে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দুই লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন থাই পেয়ারা উৎপাদন হয়েছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৩৬ হাজার টনে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের উৎপাদন তথ্য এখনো তৈরি না হলেও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, আগের বছরের চেয়ে উৎপাদন ১২-১৫ শতাংশ বেড়ে থাকতে পারে। 


মাল্টা ও কমলা : বছর পাঁচেক আগেও মাল্টা ও কমলার পুরো চাহিদা পূরণ হতো আমদানির মাধ্যমে। বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন দিয়ে এসব ফলের ১৫-২০ শতাংশ চাহিদা পূরণ হচ্ছে। আগামী কয়েক বছরে প্রায় ৪০ শতাংশ পূরণ সম্ভব বলে মনে করছেন কৃষিবিদরা। বিবিএসের হিসাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট ছয় হাজার ১১৯ টন মাল্টা ও কমলা উৎপাদন হয়েছিল। এর মধ্যে দুই হাজার ৭২৬ টন মাল্টা এবং বাকি তিন হাজার ৩৯৩ টন কমলা। ডিএইর কর্মকর্তারা আশা করছেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাল্টা ও কমলার ফলন ২০ হাজার টনের বেশি হবে। 


ড্রাগন : দেশে ড্রাগন ফলের চাহিদার ৩০ শতাংশই পূরণ হচ্ছে দেশীয় উৎপাদন দিয়ে। একসময় গুটিকয়েক ফলের বাজারে অভিজাত শ্রেণির জন্য এ ফল আমদানি হলেও এখন পাওয়া যায় ছোট-বড় সব বাজারেই। বিবিএসর হিসাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩৫ টন ড্রাগন উৎপাদন হয়েছিল। 


স্ট্রবেরি : ২০১৫-১৬ অর্থবছরের দিকে স্ট্রবেরি চাষের উৎসাহটা বেশি ছিল কৃষকদের। বিবিএসের তথ্য বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৮১ টন স্ট্রবেরি উৎপাদন হয়েছিল দেশে। কিন্তু পরের বছর তা কমে ৬০ টনে নেমে আসে। ২০১৮-১৯ সালে স্ট্রবেরি উৎপাদন হয় মাত্র ৫৪ টন। 


মেলন : মেলন বা ছোট সবুজ তরমুজও ব্যাপক উৎপাদন হচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ৪১ হাজার টন মেলন উৎপাদন হয়েছে। আগের বছর ছিল ৪০ হাজার টন। 


থাই পেঁপে : ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে পাকা পেঁপে উৎপাদন হয়েছিল এক লাখ ৩৫ হাজার ৮০০ টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল এক লাখ ৩১ হাজার ৬০০ টন। দেশি পেঁপের মতোই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এসব পেঁপে। 


অন্যান্য : বিদেশি ফলের মধ্যে রাম্বুটান নরসিংদী, সিলেট, খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদন হচ্ছে। দেশে বর্তমানে ৬০টির মতো অ্যাবাকাডোর গাছ রয়েছে। থাইল্যান্ডের উচ্চ ফলনশীল আম, লিচু ও শরিফা, স্টার ফুড, আঠা ছাড়া লাল কাঁঠাল, উন্নত জাতের জাম্বুরা দেশে অল্পবিস্তর উৎপাদন হচ্ছে। কেউ কেউ বাণিজ্যিক ভিত্তিতেও চাষ শুরু করেছে। কয়েক বছরের মধ্যে বিদেশি আরো কয়েকটি ফল দেশীয় উৎপাদনের তালিকায় যোগ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। 
 

You May Also Like