মাছ চাষের নতুন যুগে

২০০০ সালের মার্চে ইসরায়েলি বিজ্ঞানী ড. ইয়োরাম এভনিমিলেচ মাছ চাষের নতুন এক পদ্ধতির কথা প্রকাশ করেন এক জার্নালে। তিনি দেখলেন মাছ চাষে ভীষণভাবে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। যে পুকুরে মাছ চাষ হয় বছরের পর বছর সে পুকুরের পানি ও মাটি দূষিত হচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণের পথ বাতলে দিলেন Active Suspension Ponds, a New Concept in Water Treatment শিরোনামের আর্টিক্যালে। সে পদ্ধতিই পরে বায়োফ্লক টেকনোলজি হিসেবে সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সে হিসেবে বায়োফ্লক সিস্টেম প্রায় ২০ বছরের পুরনো। বিভিন্ন দেশের মাৎস্যবিজ্ঞানীরা এ সিস্টেমটাকে নিজেদের মতো ব্যবহার করার জন্য গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। শুধু বাড়ির আঙিনায় পুকুরে স্বাদু পানির মাছ চাষে নয়, বিশাল সমুদ্রে সামুদ্রিক মাছ চাষেও নানাবিধ পরীক্ষা-গবেষণা চলছে। আরএএস (রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম)-এর কল্যাণে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার মরু অঞ্চলেও বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছিল মাছের খামার। সেখানেও বায়োফ্লক টেকনোলজিতে মাছ চাষের নানা গবেষণা চলছে। আমরা যেমন দেখেছি কালিগঞ্জের বালু নদে, চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে প্রবহমান পানিতে খাঁচা পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা হচ্ছে, তেমনি সমুদ্রেও বিশালাকার খাঁচা তৈরি করে এভাবে মাছ চাষ হচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। উন্নত দেশগুলো সমুদ্রকে খাদ্য উৎপাদনের অনন্য আধার হিসেবে ব্যবহার করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে অনেক আগে থেকেই। বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সমুদ্রকে বিজ্ঞানসম্মত ব্যবহার করার বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েছে বিভিন্ন দেশ। গত বছর চীনের চিংদাওয়ে অবস্থিত ওশান ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে ব্লু-ইকোনমি নিয়ে তাদের বিস্তর গবেষণার কিছু অংশ দেখার সুযোগ হয়েছিল। সেখানকার গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি, খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে সমুদ্রকে কীভাবে জয় করা যায় তা নিয়েই তাদের ভাবনাচিন্তা। বিষয়টি শুধু ভাবনাচিন্তার মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাছ উৎপাদনকে তারা নিয়ে গেছে রীতিমতো ইন্ডাস্ট্রিতে। দুই বছর আগে ‘আরএএস’ পদ্ধতির উপকরণ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ইওয়াটার অ্যাকুয়াকালচার ইকুইপমেন্ট টেকনোলজির চীনের জানসান এলাকায় স্থাপন করা বিশাল আকার মাছের কারখানা দেখিয়েছিলাম চ্যানেল আইয়ের ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানে। তারাও নিত্যনতুন প্রযুক্তি তৈরি করে যাচ্ছে। গবেষকরা গবেষণা করে খামারি বা কৃষক পর্যায়ে পৌঁছে দিচ্ছেন কৌশল বা টেকনোলজি। এর ভিত্তিতেই খামারি পর্যায়ে উৎপাদনব্যবস্থা একটি নিরাপদ শৃঙ্খলা মেনে চলছে। কিন্তু আমাদের দেশে ঠিক যেন উল্টো। অনলাইনে বা ইউটিউবে দেখে আমাদের দেশের খামারিরা যে গতিতে নিজের মতো করে চাষবাস করছেন, সে গতির থেকে অনেক শ্লথ আমাদের গবেষণা। প্রায় বছর তিনেক হতে চলল আমাদের দেশের তরুণরা বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষের চেষ্টা করে চলেছেন। কেউ কেউ সফল হচ্ছেন, কেউ কেউ হচ্ছেন না। সফলরা কেন সফল হচ্ছেন, আর যারা সফল হচ্ছেন না তারা কেন সফল হতে পারছেন না তা নিয়ে একটা গবেষণা হতে পারত। এ ছাড়া আমাদের দেশের তরুণ উদ্যোক্তারা একেকজন একেক প্রক্রিয়ায় বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে আসছেন। প্রচুর শিক্ষিত তরুণ এ প্রক্রিয়ায় মাছ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। প্রতিদিনই এমন উৎসাহী তরুণের ফোন, ইমেইল, চিঠি পাচ্ছি। তারা মাছ চাষে দারুণভাবে আগ্রহী। আমাদের গবেষকরা তাদের যদি একটা সঠিক গাইডলাইন দিতে পারতেন, আমার বিশ্বাস আমরা মাছ চাষে নতুন বিপ্লব দেখতে পেতাম। কেন বলছি এ কথা? তার একটা ব্যাখ্যা আমি দিচ্ছি। ভারতের উড়িষ্যায় কভিডকালীন সৃষ্ট বেকারত্ব দূর করতে ও তরুণদের মাছ চাষে আগ্রহী করতে বায়োফ্লক টেকনোলজিতে মাছ চাষের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। যেখানে সরকার উদ্যোক্তাদের ৪০% সাবসিডি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। সূত্র : উড়িষ্যা টিভি। তার মানে বায়োফ্লক টেকনোলজি নিয়ে উড়িষ্যা সরকার ভালোভাবেই এগোচ্ছে। যা হোক, আমাদের দেশে খামারিরা থেমে নেই। তারা নিজেরাই নিজেদের মতো করে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এমন এক খামারির কথাই আপনাদের জানাতে চাই। যিনি গত তিনটি বছর ধরে বায়োফ্লক টেকনোলজি নিয়ে অনলাইনে পড়াশোনা করছেন, নিজের খামারে গবেষণা করে চলেছেন। বলছিলাম মাছ চাষের জন্য পরিচিত ময়মনসিংহের ভালুকা অঞ্চলের উদ্যমী তরুণ আশ্রাফুলের কথা। তিনি ২০১৭ সালে প্রথম ইউটিউব দেখে আরএএস পদ্ধতিতে মাছ চাষে উদ্যোগী হন। কিন্তু সফল হননি। তবে ব্যর্থতা তাকে দমাতে পারেনি। ২০১৮ সালে তিনি বায়োফ্লক নিয়ে বিস্তর জানা-বোঝার চেষ্টা করলেন। প্রচেষ্টা চালিয়ে গেলেন দুই বছর ধরেই। এখন এ বিষয়টিতে বেশ আস্থাশীল হয়ে উঠেছেন। আশ্রাফুল ইতোমধ্যে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী খামার গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়তা করেছেন। যা হোক, আশ্রাফুল মাত্র ৭ শতাংশ জমিতে গড়ে তুলেছেন বায়োফ্লক সিস্টেম। বলা যায় মাছের কারখানা। অনেক আগে থেকেই মাছ চাষে অগ্রসর এ এলাকা। মাছ চাষের লাভ-লোকসান এখানকার নতুন প্রজন্মের মজ্জাগত। তারা বোঝেন, জানেন মাছ চাষে কীভাবে সফলতা আনতে হয়। এখানে মাইলের পর মাইল আবাদি খেত মাছ চাষের পুকুরে পরিণত হয়েছে। তারা সবাই জানেন, কত বিঘা জলায়তন থেকে বছরে কত মাছ তোলা যায়। কিন্তু ঘরের ভিতরে ছোট্ট পরিসরে মাছ চাষ করে বিরাট একটি পুকুরের সমান ফলন তোলার বিষয়টি তাদের ধারণায় ছিল না। আশ্রাফুল নয়টি ট্যাংকে করছেন মাছ চাষ ও গবেষণা। এর আটটি ট্যাংকের ধারণ ক্ষমতা ৭ হাজার লিটার করে। একটি ট্যাংকের ধারণ ক্ষমতা ১০ হাজার লিটার। এর আগে আশ্রাফুল শিং, পাবদা, তেলাপিয়া চাষ করেছেন বায়োফ্লকে। কিন্তু বর্তমানে সব ট্যাংকেই পাঙ্গাশ চাষ করছেন। তবে দুই ধরনের পাঙ্গাশ উৎপাদন করছেন। দুটি ট্যাংকে চলছে বড় আকারের পাঙ্গাশ চাষ আর বাকি সাতটি ট্যাংকে পাঙ্গাশের ধানি পোনা উৎপাদন। পোনা আছে মোট ৫২ হাজার। যেহেতু এ বছর দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হয়ে গেছে। মাছের পোনার একটা বড় ধরনের চাহিদা তৈরি হবে। তা মাথায় রেখেই তিনি পাঙ্গাশের পোনা চাষে উদ্যোগী হয়েছেন। যে দুটি ট্যাংকে মাছ বড় করছেন তার প্রতিটিতে আছে ৫৫০টি করে মাছ। পোনা মাছ যখন ছেড়েছিলেন তখন ৩০টিতে ছিল ১ কেজি। দেড় মাসেই চারটিতে ১ কেজি ওজন হয়। আশ্রাফুলকে বললাম একটি ট্যাংক ধরে লাভ-ক্ষতির একটা হিসাবে দিতে। তিনি জানালেন, বায়োফ্লক সিস্টেমে একটা ট্যাংক প্রস্তুত করতে অ্যারেটর, অক্সিজেন পাম্প সব মিলিয়ে ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হবে। আর এ ট্যাংকটি কমপক্ষে ১০ বছর স্থায়ী হবে। এবার আসা যাক ৭ হাজার লিটার ধারণ ক্ষমতার একটি ট্যাংক থেকে চার মাসে পাঙ্গাশ চাষে কী পরিমাণ খরচ হয় সে হিসাবে। আশ্রাফুল জানালেন, একটি ট্যাংকে ৫৫০টি পাঙ্গাশের পোনা ছেড়েছেন প্রতিটি ৫ টাকা দরে। আর খাবার খরচ হবে খুব বেশি হলে ১২ হাজার টাকা। অর্থাৎ সব মিলে চার মাসে খরচ ১৫ হাজার টাকার বেশি নয়। ৮০ টাকা কেজি দরে পাঙ্গাশ বিক্রি করলেও তিনি ৪৫ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করতে পারবেন। যে তরুণটি এখন বেকার বসে আছেন, কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না তিনি চাইলে মাত্র ২ শতাংশ জায়গায় তিনটি ট্যাংক বসিয়ে মাত্র লাখখানেক টাকা বিনিয়োগ করে খুব সহজেই সব খরচ বাদে মাস প্রতি ২৫ হাজার টাকা লাভ করার সুযোগ রয়েছে। আশ্রাফুল ট্যাংকগুলোর ওপর নেট দিয়ে ঘিরে ওপরে মাচা তৈরি করে দিয়েছেন। মাচায় হচ্ছে মৌসুমি সবজির ফলন। সবজি চাষ করেও ভালো আয় হচ্ছে তার। বলছিলাম, আশ্রাফুল বায়োফ্লক নিয়ে নানামুখী গবেষণা করছেন। তার চেষ্টা প্রযুক্তিটিকে কীভাবে অনেক বেশি লাভজনক করে তোলা যায়। তিনি জানার চেষ্টা করছেন বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষের নানা দিক। নতুন এ পদ্ধতিতে মাছ চাষে কী কী সমস্যা আসতে পারে সে বিষয়গুলোর প্রতিও খেয়াল রাখছেন। বিশেষ করে কোন ধরনের মাছ আমাদের দেশে বায়োফ্লকের জন্য উপযোগী। কোন কোন উপকরণ ব্যবহার করে কম খরচে অধিক মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। উৎপাদিত মাছ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত কিনা। এসবই তার মূল গবেষণার দিক। আশ্রাফুল জানিয়েছেন, প্রোবায়োটিক উৎপাদনটা বায়োফ্লকের মূল চ্যালেঞ্জ। এর জন্য তিনি ঝোলাগুড় ব্যবহার করেন। অনেকে চিটাগুড় ব্যবহার করেন। তবে আশ্রাফুল বলছেন, ঝোলাগুড় ব্যবহারে ফল ভালো পাচ্ছেন। তিনি একেকবার ট্যাংকে একেক মাছ চাষ করে দেখছেন, কোনটা ভালো হয়। আপনাদের নিশ্চয়ই কুমিল্লার তরুণ উদ্যোক্তা রোমেলের কথা মনে আছে। তারও বায়োফ্লক খামারের কথা আপনাদের বলেছিলাম। রোমেলও একেকটি ট্যাংকে একেকরকম মাছ চাষ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। বোঝার চেষ্টা করেছেন, বায়োফ্লকে কোন মাছ চাষ অধিকতর লাভজনক। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে বায়োফ্লক দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে তরুণ উদ্যোক্তাদের এ ধরনের উদ্যোগ ও সফলতা দেখে মন আনন্দে ভরে ওঠে। সবচেয়ে আশার কথা, একেকজন তরুণ উদ্যোক্তা শুধু নিজে বায়োফ্লক করছেন তা-ই নয়, তারা আরও বহু নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করছেন। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের জহুরুল ও মুস্তাফিজের বায়োফ্লক খামারে মাছের উৎপাদন পরীক্ষার চিত্র ধারণের সময় বহুসংখ্যক নতুন উদ্যোক্তার সন্ধান পেয়েছিলাম; যার অনেকেই কয়েক মাসে বায়োফ্লক প্রকল্প গড়ে সাফল্যের নজির রেখেছেন।  মাছ চাষের এ পদ্ধতিগুলো ভালোমতো না জেনে-বুঝে উদ্যোগী হলে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই উদ্যোগ নেওয়ার আগে বিষয়টি সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও উন্নয়ন সহযোগী সংগঠনগুলোর এগিয়ে আসা উচিত। বায়োফ্লক টেকনোলজির একটি আদর্শ গাইডলাইন তৈরি করা যেমন জরুরি, তেমনি এ নিয়ে বিস্তর গবেষণারও প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। 
মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।   
 

You May Also Like