পাস্তুরিত দুধের এগিয়ে চলা

শুরুটা হয়েছিল সরকারের হাত দিয়ে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রক্রিয়াজাত পাস্তুরিত তরল দুধের কারখানা স্থাপন করে সরকার। তখন উৎপাদন ও বাজার ছিল সীমিত। এরপর ধীরে ধীরে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আসায় প্রক্রিয়াজাত দুধের উৎপাদন যেমন বাড়ছে, তেমনি বাজারও বেড়েছে। খোলা দুধ সরবরাহের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে এখন প্যাকেটজাত তরল দুধ কেনায় ক্রেতাদেরও ঝোঁক বাড়ছে। তবে গত এক দশকে দুধের উৎপাদন সাড়ে চারগুণের বেশি বাড়লেও প্রক্রিয়াজাত দুধ উৎপাদন বাড়েনি। যদিও এ খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও সুযোগ আগের চেয়ে বেড়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগাতে ব্র্যান্ডগুলো তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে। পাশাপাশি নতুন কোম্পানিও বিনিয়োগে আসছে। 

বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৩ সালে খামারিদের দুধের সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সমবায়ের মাধ্যমে একটি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত কারখানা স্থাপন করে। এটিই এখন বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন বা মিল্ক ভিটা নামে পরিচিত। দুই দশকের বেশি সময় ধরে মিল্ক ভিটাই এ খাতে একক কোম্পানি ছিল। নব্বইয়ের দশকে টিউলিপ ডেইরি তরল দুধের প্রক্রিয়াজাত কারখানা স্থাপন করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। তবে বেশি দিন টিকতে পারেনি। এখনকার বড় ব্র্যান্ড আড়ং ১৯৯৮ এবং প্রাণ ২০০১ সালের দিকে পাস্তুরিত তরল দুধের কার্যক্রম শুরু করে। পর্যায়ক্রমে এ খাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আসে। 
এ পর্যন্ত প্রক্রিয়াজাত ডেইরি শিল্পে ১৫ প্রতিষ্ঠানের দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ রয়েছে। সম্প্রতি এ খাতে নতুন বিনিয়োগে এসেছে ইয়ন গ্রুপ। অস্ট্রেলিয়া থেকে গরু আমদানি করে খামার করেছে। এখন প্রক্রিয়াজাত কারখানা স্থাপন করছে। এছাড়া মাঝে কিছুদিন বন্ধ থাকলেও দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত কার্যক্রম আবার চালু করেছে আফতাব ডেইরি। অনেক কোম্পানি আগামী ৫ বছরে উৎপাদন দ্বিগুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আরও পাঁচটি হাব স্থাপনের পরিকল্পনা করছে প্রাণ ডেইরি। আকিজ ডেইরিও দুধ সংগ্রহ ও উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। এছাড়া রংপুর ডেইরির কারখানা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। 

দুধ উৎপাদন পরিস্থিতি 
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে এক কোটি সাত লাখ টন দুধ উৎপাদন হয়েছে। ১০ বছর আগে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল প্রায় ২৩ লাখ টন। এ হিসেবে উৎপাদন বেড়েছে ৪ দশমিক ৬৭ গুণ। যদিও চাহিদার তুলনায় উৎপাদনে অনেক ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে দৈনিক জনপ্রতি ১৭৫ মিলিলিটার দুধ উৎপাদন হচ্ছে। দৈনিক একজনের ২৫০ মিলিলিটার দুধ পান করা প্রয়োজন ধরে নিলে বছরে চার কোটি টন চাহিদা রয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে আমদানি না করে উল্টো রপ্তানির সুযোগের কথাও বলছেন সংশ্নিষ্টরা। 

একই সময়ে অবশ্য প্রক্রিয়াজাত দুধের উৎপাদনও বেড়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এক দশক আগে মোট দুধের ৫ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত হয়েছে। এখন তা বেড়ে ১৩ শতাংশ হয়েছে। বর্তমানে ১৪ লাখ টন দুধ প্রক্রিয়াজাত করছে কোম্পানিগুলো। অন্যদিকে ১৭ শতাংশ মানুষের চাহিদা পূরণ হয় পারিবারিকভাবে গরু লালনপালনের মাধ্যমে। এখনও উৎপাদিত দুধের ৭০ শতাংশ খোলাবাজারে কেনাবেচা হয়। এর বেশিরভাগ সরাসরি ক্রেতারা কিনে খান এবং বাকি অংশ দই ও মিষ্টির কারখানায় ব্যবহার হয়। করোনাকালে দুধ প্রক্রিয়াজাত কার্যক্রম বাড়লেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। এ ছাড়া বন্যার কারণে খামারিদের দুধ উৎপাদনও কমেছে। 

সরকারি উদ্যোগ 
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক আব্দুর রহিম সমকালকে বলেন, দুধ উৎপাদন বাড়াতে ও বাজারজাত করতে ৬১ জেলার জন্য কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সারাদেশে সাড়ে ৫ হাজার দুধ উৎপাদন গ্রুপ উন্নয়ন করা হচ্ছে। প্রতিটি গ্রুপে ৩০ সদস্য থাকবেন। প্রতি জেলায় হাব গঠন করে দুধ সংগ্রহ করা হবে। সারাদেশের দুধ সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বাজারজাত করতে নানা ধরনের কার্যক্রম রয়েছে। 

পাস্তুরিত তরল দুধ উৎপাদনে ১৫ কোম্পানি 
এ খাতে এক দশক আগেও দুধ উৎপাদনে হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিনিয়োগে এসেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে ১৫টির বেশি পাস্তুরিত তরল দুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিএসটিআই মান সনদ নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো দুধ উৎপাদন করছে। শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- মিল্ক ভিটা, প্রাণ ডেইরির প্রাণ মিল্ক, ব্র্যাক ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রজেক্টের আড়ং ডেইরি, আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ফার্ম ফ্রেশ মিল্ক, রংপুর ডেইরির আরডি, আফতাব মিল্ক অ্যান্ড মিল্ক, প্রোডাক্টসের আফতাব, ইগলু ডেইরির ইগলু, ড্যানিশ ডেইরি ফার্মের আইরান, ইছামতি ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রডাক্টসের পিউরা, আমেরিকান ডেইরির মুউ, উত্তরবঙ্গ ডেইরির মিল্ক ফ্রেশ ও ওয়ান মিল্ক, পূর্ব বাংলা ডেইরি ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের আকরান, শিলাইদহ ডেইরির আল্ট্রা, তানিয়া ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্টসের সেইফ এবং জিহান মিল্ক অ্যান্ড ফুড প্রসেসিংয়ের জিহান। 
এসব কোম্পানির প্যাকেটজাত দুধের বড় উৎস উত্তরাঞ্চলের জেলা সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, রংপুর, বগুড়া অঞ্চল। এছাড়া যশোর ও সাতক্ষীরার কিছু অঞ্চল থেকে খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করছে কোম্পানিগুলো। সারাদেশে এসব ব্র্যান্ডের দুধ সংগ্রহ কেন্দ্রে খামারি বা খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে ৪২ টাকা লিটার দরে দুধ সংগ্রহ করা হয়। পরে প্রক্রিয়াজাত করার বিভিন্ন পর্যায় শেষে খুচরা বাজারে ৭০ টাকা লিটার দরে বিক্রি করা হয়। 

কোম্পানির নির্বাহীদের কথা 
ইয়ন গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোমিন উদ দৌলা সমকালকে বলেন, কৃষি খাতের অন্যান্য পণ্যের চেয়ে দুগ্ধশিল্প পিছিয়ে আছে। এর বড় কারণ, দুগ্ধ খামারগুলোতে বেশি পরিমাণে দুধ উৎপাদনের গরু নেই। এখনও প্রায় চার হাজার কোটি টাকার গুঁড়া দুধ আমদানি হয়। আমদানি করা গুঁড়া দুধ হিসাব করলে চার কোটি লিটার উৎপাদনের প্রয়োজন হবে। এ হিসাবে চাহিদা ও উৎপাদনে ঘাটতি প্রায় ৭৫ ভাগ। এটা মেটাতে সরকারকে পরিপূর্ণভাবে সহায়তা করতে হবে। আমদানিনির্ভরতা কমাতে স্থানীয় খামারের দিকে নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে গরুর উন্নত জাত উন্নয়ন করতে হবে। প্রক্রিয়াজাত কারখানা স্থাপনে বিনিয়োগবান্ধব পরিকল্পিত নীতি সরকারকে গ্রহণ করতে হবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগ প্রণোদনা, কর অবকাশ সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। 

প্রাণ গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, পাস্তুরিত তরল দুধের কারখানা স্থাপন করতে অনেক বড় মূলধন প্রয়োজন হয়। তুলনামূলক অন্য খাতের চেয়ে মুনাফা কম। ব্যয়বহুল হওয়ার অন্যতম কারণ খামার থেকে কোল্ড চেইনের মাধ্যমে ভোক্তার কাছে দুধ পৌঁছে দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়ন দরকার। সরকারের নীতি সহায়তা পেলে অনেক কোম্পানি বিনিয়োগ বাড়াবে। 
কামরুজ্জামান কামাল বলেন, দেশে আমদানি করা গুঁড়া দুধ বাজারে কম দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে দেশে উৎপাদিত দুধ বিক্রির সঙ্গে সংশ্নিষ্টরা ক্ষতির মুখে পড়ছে। দেশি শিল্পের সুরক্ষায় আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম এবং কোল্ড চেইন-সংশ্নিষ্ট যানবাহন আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার করা দরকার। 
রংপুর ডেইরির কর্মকর্তা জাকারিয়া আমান জানান, ২০০৭ সালে স্বল্প পরিসরে উৎপাদনে আসার পর থেকে পর্যায়ক্রমে তারা সক্ষমতা বাড়াচ্ছেন। তারা এখন সবচেয়ে বেশি ইউএসটি দুধ উৎপাদন করছেন। বেশ কয়েকটি ফ্লেভারে এ দুধ বাজারে বিক্রি হচ্ছে। 

মানসম্মত দুধ উৎপাদন বড় চ্যালেঞ্জ 
দেশে শিল্পায়নের সঙ্গে বাড়ছে দূষণ। এর প্রভাব পড়ছে দুগ্ধ খাতেও। এ জন্য পরিকল্পিত খামার ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারি পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা। খামারিদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে মানসম্মত দুধ উৎপাদন এবং দুধ সংগ্রহ করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ.ব.ম ফারুকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে দুধে লিড ও অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়ার খবরে দেশজুড়ে দুগ্ধ খাত বিপাকে পড়ে। পরে কোম্পানিগুলো উন্নত ল্যাবে পরীক্ষায় এমন ক্ষতিকর উপাদান নেই বলে আবার নিশ্চিত করে গ্রাহকদের। ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। এমন পরিস্থিতিতে যাতে আর পড়তে না হয় সেজন্য উদ্যোক্তারা মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেন, পরিকল্পিত খাদ্য ও রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। 

বিপণন লড়াই 
বিশ্ববাজারে এক কেজি ভালো মানের গুঁড়া দুধের দাম প্রায় দেড় হাজার টাকা। অথচ দেশে আমদানি করা গুঁড়া দুধ বিক্রি হচ্ছে মাত্র গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা কেজিতে। নিম্নমানের কারণেই দাম এত কম রাখা সম্ভব হচ্ছে। এতে দেশের তরল দুধের বাজার নষ্ট হচ্ছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। এ কারণে ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না খামারিরাও। অথচ গো-খাদ্যসহ অন্যান্য ব্যয় অনেক বেড়েছে। এ অবস্থায় খামার ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন খামারিরা। ব্র্যান্ডগুলোর কর্মকর্তাদের দাবি, গুঁড়া দুধের সঙ্গে দামের লড়াই করে তরল দুধ বাজারে বিক্রি করা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় দুগ্ধশিল্পের সুরক্ষায় গুঁড়া দুধের শুল্ক বাড়িয়ে নিয়ন্ত্রণ আনা জরুরি বলে মনে করেন তারা। 

******-----------------****** 
 

You May Also Like