খাদ্য নিরপত্তায় নগরীয় কৃষি

একটি জাতীয় পত্রিকায় ॥ 

 কয়েক দিন আগে ‘নিউইয়র্কে কৃষি আঙিনা’ শিরোনামে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ছেপেছে। সংবাদে বলা হয়েছে, করোনাকালে নিউইয়র্ক সিটিতে প্রবাসীরা ঘরে ঘরে ‘আঙিনা কৃষি’ গড়ে তুলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। তারা লাউ, বেগুন, শসা, টমেটো, পেঁপে, পটোল, ঢেঁড়স, মরিচ, পালংশাক, পুঁইশাক, লালশাক, কচুপাতা, পাটশাক, ধনেপাতা, গোল আলু, আদা, রসুন, হলুদ, লেবু, করলা, চিচিঙ্গা, ঝিঙ্গা আবাদ করে ডলার সাশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৯ জুলাই, ২০২০)। যাদের বাসার পেছনে সবজি আবাদের জায়গা নেই তারা বেলকনি অথবা জানালার সঙ্গে থাকা প্লাটফরমে টব বসিয়ে সবজির বাগান করেছেন। শুধু বাংলাদেশিরাই নন, তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন পাকিস্তানি, ভারতীয়, শ্রীলঙ্কান, নেপালিরাও। সেখানে গ্রোসারি বা হাঁটাপথে কোনো টাটকা সবজির দাম পড়ে ৫ ডলার। চার সদস্যের এক পরিবারের এক বেলার জন্য সবজি কিনতে ১০ ডলারের প্রয়োজন হয়। ফলে একদিকে অর্থ সাশ্রয় যেমন হচ্ছে তেমন করোনাকালে তাদের সময়ও কেটে যাচ্ছে। আগে গৃহিণীরা শীত বিদায়ের পর মাত্র ২৫ ভাগ আঙিনায় সবজি আবাদ করতেন, এখন তারা ৮৫ ভাগ আঙিনায় সবজি আবাদ করছেন। উল্লেখ্য, সেখানে শীতকালে (প্রায় আট-নয় মাস) তুষারপাতের কারণে বাড়ির আঙিনায় সবজি আবাদ করা যায় না। তখন বাড়ির অভ্যন্তরে বিশেষ ব্যবস্থায় কেউ কেউ শখের বশে সবজি আবাদ করেন। সেখানে নতুন বাড়ি করার সময় আঙিনার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা (৪৫ থেকে ৬০% পর্যন্ত) ফাঁকা রাখতে হয়। তবে জোনভেদে ফাঁকা জায়গার পরিমাণ কমবেশি হয়। এ-জাতীয় আবাদকে এ দেশের কেউ কেউ ‘নগর কৃষি’ বলে থাকেন। কিন্তু ব্যাকরণগত দিক থেকে ‘নগরীয় কৃষি’ বাক্যটি বলা উচিত। ‘গ্রামীণ কৃষি’র বিপরীতে নগরীয় কৃষিই হওয়া উচিত। তবে নিউইয়র্ককের ওই আবাদের সঙ্গে বাংলাদেশের সবজি আবাদকে মেলানো ঠিক হবে না। এখানে ১২ মাস কোনো না কোনো সবজি আবাদ করা যায়। আমরা দীর্ঘদিন যাবৎ বলে আসছি, ২০৫০ সাল নাগাদ সমগ্র দেশের জনগণ নগরীয় সুবিধা নিয়ে বসবাস করবে। তার নমুনা ইতোমধ্যে প্রস্ফুটিত হওয়া শুরু করেছে। বর্তমানে ৩৩০টি পৌরসভা, ১২টি সিটি করপোরেশন, ১৭টি ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকা এবং হাটবাজার ও শিল্পকারখানাকেন্দ্রিক এলাকায় প্রায় ৬ কোটি লোক বসবাস করছে। প্রতি বছর ১ শতাংশ হারে কৃষিজমি শিল্প ও নগরীয় এলাকায় চলে যাচ্ছে। এ ধারা চলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৩৩ ভাগ এলাকা নগরে পরিণত হবে। দেশের ৭৫% জনগোষ্ঠী নগরে বসবাস করবে। সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ৩ হাজারটি হাটবাজার (গ্রোথ সেন্টার)-কেন্দ্রিক এলাকাকে নগরীয় ইউনিট তথা পৌরসভা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া। বর্তমানে ৪০% লোক কৃষি পেশায় জড়িত। আগামীতে মাত্র ২৫% লোক এ পেশায় জড়িত থাকবে। তখন ৭৫% লোক অন্য পেশায় চলে যাবে। তাদের দক্ষ কর্মজীবী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পর্যাপ্ত কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান সরকার প্রতিটি জেলায় নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের চিন্তাভাবনা করছে। সবার জানা রয়েছে, বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী অনার্স-মাস্টার্সের ডিগ্রি নিয়ে বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যায় দক্ষ না হওয়ায় শিল্পকারখানায় চাকরি পাচ্ছেন না। অন্যদিকে নগরীয় কৃষির বিষয়ে সরকারের কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে বলে মনে হয় না। অথচ নগরীয় কৃষি একদিকে যেমন খাদ্য নিরাপত্তা দেবে, অন্যদিকে পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সে কারণে পাঠ্যপুস্তকে নগরীয় কৃষির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নগরীয় ইউনিটে নগরীয় কৃষিবিদদের নিযুক্তি দিতে হবে। স্থানীয় সরকারের বিধিবিধানে পরিবর্তন এনে প্রতিটি নগর, হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নগরীয় কৃষি আবাদের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে কৃষিজমি রক্ষার বিষয়ে কঠোর নজরদারি চালু করতে হবে। এসব কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য স্থানীয় সরকারকে কার্যকর করতে হবে। বর্তমান স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গণতন্ত্র উপযোগী নয় এবং এগুলো অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ। সেজন্য ইউনিটগুলোর স্তরবিন্যাস, প্রকারভেদকরণ, নামকরণ ঠিক করতে হবে। ‘সিডিএলজি’ দীর্ঘদিন যাবৎ বলে আসছে, এ দেশে দুই প্রকারের সরকারব্যবস্থাই বাস্তবায়নযোগ্য। তথা কেন্দ্রীয় সরকারব্যবস্থা আর স্থানীয় সরকারব্যবস্থা। স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ স্তর হবে ‘জেলা সরকার’। জেলা সরকার এক হাতে গ্রামীণ স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন ও উপজেলা) এবং অন্য হাতে নগরীয় স্থানীয় সরকার (সিটি, পৌর ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড) নিয়ন্ত্রণ করবে। গ্রামীণ ইউনিটের সংখ্যা ক্রমে হ্রাস পেতে পেতে একসময় সব নগরীয় ইউনিটে পরিণত হবে। তখন জেলা সরকারের অধীনে কেবল ‘নগর সরকারগুলো’ থাকবে। জেলা সরকারের সঙ্গে কেবল কেন্দ্রের সম্পর্ক থাকবে। মনে রাখা দরকার, আমাদের দেশের কৃষিব্যবস্থা কেমন হবে, তা আমাদেরই ভাবতে হবে। নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারের কারণে ‘নগরীয় কৃষি’ হবে খাদ্য নিরাপত্তার বড় সেক্টর। 
লেখক : গবেষক।  
 

You May Also Like