উত্তরে খামারিদের মাথায় হাত

ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি (উত্তরাঞ্চল) ॥ 

করোনা ও বন্যার প্রভাব পড়েছে রংপুরসহ উত্তরের হাটগুলোতে। সেই সঙ্গে আতঙ্ক ছড়িয়েছে গরুর লাম্পি স্কিন রোগ। গরু কেনায় তেমন আগ্রহ নেই ব্যবসায়ীদের। হাটে সাধারণ ক্রেতাদেরও নেই তেমন ভিড়। তবে হাটে যাওয়ার চেয়ে বাড়িতে অথবা ব্যক্তি পর্যায়ে গড়ে উঠা খামারের গরুগুলোর দিকে আগ্রহ বেশি। রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উপপরিচালক ডা. হাবিবুল হক জানান, চলতি বন্যা ও লাম্পি স্কিন রোগের প্রভাব পড়বে না কুরবানির পশুতে। বিভাগের আট জেলায় কুরবানির পশুর চাহিদা সাড়ে ৬ লাখ হলেও কুরবানিযোগ্য পশু মজুত আছে ৭ লাখ ৭২ হাজার ৮৮১টি। এর মধ্যে ষাঁড়, বলদ, গাভী, মহিষ ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৫৩৪টি, ছাগল, ভেড়াসহ অন্যান্য ২ লাখ ৭১ হাজার ২৩৩টি এবং গৃহপালিত পশু আছে ১ লাখেরও বেশি। তাই স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে পশু যাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে। এ জন্য সড়ক পথের পাশাপাশি নতুন সংযোজন হিসেবে রেলপথকেও বেছে নেয়া হয়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদের যৌথ উদ্যোগে অনলাইনে সহজে পশু কেনার সুব্যবস্থাও করা হয়েছে। এ জন্য অনলাইনে রংপুর জেলায় ৯টি পশুরহাট চালু করা হয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ‘পশুরহাট’ নামে একটি অনলাইন পেজ খুলে এই হাট চালু করেছে। এই অনলাইন পেজে গরু-মহিষ-ছাগল পালনকারীদের পশুর ছবি সংবলিত বিভিন্ন তথ্য রয়েছে। পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় খামার ও বাসাবাড়িতে কুরবানিযোগ্য প্রায় ৮ লাখ পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে করোনা ও বন্যা দুর্যোগের কারণে পশুর প্রত্যাশিত দাম পাওয়া নিয়ে এ অঞ্চলের খামারি সংশয়ে আছেন। অনেকেই কম দামে গরু বিক্রি করছেন। অফিস সূত্রে জানা গেছে, রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত গরুর খামারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৮ হাজার। এসবের প্রতিটি খামারে ৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত গরু রয়েছে। শুধু রংপুর জেলায় খামার রয়েছে ৩ হাজার ১৪৯টি। এর মধ্যে নিবন্ধিত রয়েছে ১ হাজার ৩২৮টি। এদিকে করোনার কারণে গরু কুরবানি দেয়ার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না অনেকেই। হাটে যাওয়া থেকে বিরত রয়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। নগরীর রাধাবল্লভ এলাকায় যেখানে প্রতি বছর ২৫-৩০টি গরু কুরবানি হতো, সেখানে এবার ১০-১২ জন কুরবানি দিবেন বলে শোনা গেছে। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বজরা এলাকার আবদুল কাইয়ুম জানান, তাদের এলাকা থেকে প্রতি কুরবানির ঈদে ট্রাকে ট্রাকে গরু ঢাকাসহ অন্যান্য জেলায় পাইকাররা নিয়ে গেলেও এবার এখন পর্যন্ত তা লক্ষ্য করা যায়নি। সিটি করপোরেশন এলাকার মৌলভীরবাজার এলাকার আলাউদ্দিন, রহিমা ও পরশুরাম এলাকার আবুল হোসেন জানান, বাড়িতে পোষা তাদের ৪টি গরু ৪৫ হাজার থেকে ৬২ হাজার পর্যন্ত বলে গেলেও এখন পর্যন্ত তা বিক্রি হয়নি। ক্রেতা মানিক হোসেন ও আরিফুজ্জামান হানিফ বলেন, যে গরু গত ঈদে ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকার কেনা হয়েছে এবার তা ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকায় কেনা যাবে বলে ধারণা করছেন। পশ্চিম খটখটিয়া এলাকার বাসিন্দা রেজওয়ানুল হক টফি জানান, শিক্ষিত হয়ে দেশে কোনো চাকরি জোটেনি তার ভাগ্যে। সংসারের বোঝা না হয়ে পাড়ি জমান বিদেশে। সেখানে ৫ বছর থাকার পর বাড়িতে এসে শুরু করেন গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্প। তার খামারে ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা দামের ১৫টি গরু আছে। প্রতিটি গরুর জন্য প্রতিদিন তার খরচ হচ্ছে কমপক্ষে ৫০০ টাকা। গেল বছর পশু খাদ্যের দাম কম থাকলেও এ বছর করোনা ও বন্যার কারণে খাদ্যের দাম বেড়েছে। কিন্তু বাড়েনি গরুর দাম। এখন পর্যন্ত অনেকেই খামারে এসে গরুর দাম বললেও তাতে তার গরু কেনা ও লালন-পালনের দাম উঠবে না বলে তিনি মনে করেন। খামারি সাইফুল ইসলাম এবারের ঈদে পশুর ন্যায্য মূল্য পাবেন না জেনে অনেক আগেই কম দামে গরু বিক্রি করেছেন। বুক ভরা আশা নিয়ে তার মতো অনেকেই গরু লালন-পালন করলেও এ বছরও দাম না পাওয়ার শঙ্কায় খামারিরা। এদিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে গোটা বিভাগে প্রায় ৪০০ কুরবানির পশুরহাটে কেনাবেচার ব্যবস্থা করছে জেলা প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্রেতা-বিক্রেতারা যাতে নিরাপদে পশু কেনাবেচা করতে পারেন সে জন্য সব ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রতিটি পশুরহাটে মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধাসহ জালটাকা শনাক্তকরণ মেশিন থাকবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তৎপর থাকবে। 

You May Also Like