গ্রামীণ উন্নয়নের মূলমন্ত্র কৃষি

যেকোনো দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য গ্রামীণ উন্নয়ন অপরিহার্য। আর গ্রামীণ অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ ও অবকাঠামো উন্নয়নের আবশ্যিক পূর্বশর্ত কৃষি স্বনির্ভরতা। যে দেশের গ্রামীণ জনপদ কৃষিজ দিক থেকে যত বেশি স্বাবলম্বী, সে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও কাঠামো তত বেশি সুন্দর ও শক্তিশালী। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্র কৃষি উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কেননা কৃষির উন্নয়ন মূলত কৃষকের উন্নয়ন ও দেশের অগ্রগতির মূল হাতিয়ার। আমাদের দেশের অর্থনীতির বৃহৎ অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই গ্রামীণ কৃষিনির্ভর জনপদকে অবহেলা বা অনীহা করে সার্বিকভাবে দেশের উন্নয়ন কামনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বর্তমানে আমরা উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তর হয়েছি। এখান থেকে উন্নত দেশে উন্নীত হতে হলে আমাদের গ্রামীণ উন্নয়ন অপরিহার্য, আর গ্রামীণ উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে কৃষি বিপ্লবের বিকল্প নেই। তাই কৃষি বিপ্লবের জন্য গ্রামাঞ্চলের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতির জন্য সুপরিকল্পিত পদপে নেওয়া আবশ্যক। বাংলাদেশকে একটি স্বাবলম্বী ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার ল্েয, সংবিধানে গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লব রাষ্ট্র পরিচালনা একটি মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে সংবিধানে উল্লেখ করা হয়েছে, শহর ও গ্রামাঞ্চলে মানুষের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য দূর করার নিমিত্তে গ্রামীণ উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে হবে। সঙ্গে কৃষি বিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে শিা, বৈদ্যুতিককরণ ব্যবস্থার উন্নতি, যোগাযোগ ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে রহিত জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আমাদের দেশে গ্রাম ও শহরের মাঝে প্রকট তফাৎ ছিল। গ্রামে সভ্যতার আলো তখন ছিল ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। সে সময় কৃষিকাজ সম্পন্ন হত নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, ভঙ্গুর অবকাঠামো, উন্নত বীজের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় কৃষকদের অপারগতার ফলে দেশে কৃষি বিপ্লব ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। তৎকালে খাদ্যের চাহিদা ছিল এক কোটি ২০ টন। তার বিপরীতে খাদ্য উৎপাদন হতো এক কোটি টন। সে সময়ে খাদ্য উৎপাদনে যে পরিমাণ ভূমি ব্যবহৃত হত, বর্তমানে সেই অনুপাতে ভূমির পরিমাণ ২০ শতাংশ কমে গেলেও খাদ্য উৎপাদন বেড়ে সাড়ে তিন কোটি টনের কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে কৃষি কাজের প্রতি অনীহা, ফলনে আশানুরূপ লাভবান না হওয়ায় বর্তমানে কৃষি পেশা হিসেবে যথেষ্ট অপছন্দে পরিণত হয়েছে। কৃষির এমন দুরবস্থার পেছনে ব্যক্তিগত ও সামাজিক বেশ কিছু কারণ বিদ্যমান। এছাড়াও খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, মোট জাতীয় আয় ও উৎপাদনে ব্যাপক ভূমিকা রাখার সঙ্গে সর্বাধিক কর্মসংস্থানের উৎস হওয়া সত্ত্বেও কৃষি পেশা হিসেবে এখনও অনীহার স্বীকার। চলমান সমস্যার মধ্যে প্রথমত, কৃষিব্যবস্থা প্রকৃতির খেয়ালখুশির ওপর নির্ভরশীল। কেননা, কৃষিজাত ফসল অতি দ্রুত পচে যায়। সাধারণত মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে অতিবৃষ্টির কারণে প্রতি বছর ব্যাপক ফসল নষ্ট হয়ে যায়। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে কৃষি কাজ ও পেশা হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। আবার আবাদযোগ্য ভূমির পরিমাণ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। দ্রুতগতিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও তাদের আবাসস্থল তৈরিতে দেশের মোট আবাদকৃত জমির একটি বড় অংশ প্রতি বছর কমে যায়। ফলে কৃষি বিপ্লব হুমকির মুখে ও অসম্ভব মনে হয়। কৃষিকাজে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে অধিকাংশই দরিদ্র। যার ফলে পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে অনেক সময় কৃষকের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ফসল ফলানো সম্ভব হয় না। অনেক সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা তাদের ঋণের সমাঝোতা করলেও শর্তাবলির দুর্বোধ্যতা, গ্রহণে আপত্তি, ঋণ গ্রহণের কৌশল না বোঝা ও অশিতি হওয়ায় ঋণ দেওয়া বা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আবার, কৃষকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেিত উপযুক্ত, সময়োপযোগী ও আধুনিক প্রযুক্তির স্বল্পতা এখনও পরিলতি হচ্ছে। অনুন্নত, দুর্বল ও লাগামহীন বাজার ব্যবস্থার কারণে কৃষি পণ্যের উপযুক্ত মূল্য প্রাপ্তির শঙ্কা কৃষিকে অপছন্দনীয় পেশাতে পরিণত করেছে। সর্বোপরি অশিতি জনসমষ্টির কৃষিজ ফসল ও ফলফলাদির পুষ্টিমান সম্পর্কে সীমাবদ্ধ জ্ঞান কৃষিকে পিছিয়ে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি, সার-কীটনাশকসহ কৃষি সহায়ক দ্রব্যের চড়া মূল্যের কারণে কৃষকরা কম লাভবান হচ্ছে। যার ফলে ফসল ফলানো অনেকাংশে যুক্তিহীন বলে বিবেচিত হচ্ছে। অশিতি কৃষকগণ বাজার ব্যবস্থা ও বিপণন সম্পর্কে না জানায়, একবছরে যে ফসলে লাভবান হয়, পরবর্তী বছরে একই ফসল উৎপাদনে উদ্যোগী হয়। এভাবে একজনকে লাভবান হতে দেখে অনেক কৃষক একই ফসল উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে ফসলের বাড়তি উৎপাদনের কারণে মূল্য হ্রাস পায়। কৃষক তিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের সার্বিক অগ্রগতিতে কৃষির ভূমিকা যেহেতু অনেক, সেহেতু কৃষি বিপ্লবের বিকল্প নেই। চাষের উপযোগী প্রত্যেকে ইঞ্চি ভূমিতে উন্নত বীজ, সার ব্যবহারের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিবিড় চাষাবাদে তরুণ প্রজন্মকে কৃষি পেশাতে আকৃষ্ট করে বৃহৎ পরিসরে কৃষিজ কাজ সম্পূর্ণ করার পদ্ধতিকে ‘কৃষি বিপ্লব’ বলা হয়। বর্তমানে কোনো পরিবারই তাদের সন্তানকে কৃষি পেশায় নিযুক্ত করতে চায় না। ফলে সামাজিক মূল্যহীনতা ও দৃষ্টিভঙ্গি কৃষি থেকে তরুণ প্রজন্মের মেধাবীদের পৃথক করছে। কৃষি বিপ্লবের বিকাশ সাধনে নতুন প্রজন্মকে এ পেশায় যুক্ত করার বিকল্প নেই। আমাদের কৃষি এখনো পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ, কৃষি বিপ্লবের মূল উদ্দেশ্য, কৃষির বৃহত্তর আকারে সম্প্রসারণ। আধুনিক বিশে^র বিশাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে কৃষিকে আধুনিকায়ন করা। গবেষণা করে পরিবেশের উপযুক্ত, সহনশীল ও উন্নত বীজ উৎপাদন করতে হবে। যেন কৃষক কোনোভাবেই য়তির সম্মুখীন না হয়। পাশাপাশি বীজ ও কীটনাশকের লাগামহীন বাজার ব্যবস্থাকে রুখে সরকারি আয়ত্তে নিয়ে সুষম বণ্টন করাও প্রয়োজন। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিপ্রেেিত সমস্যাগুলো যথার্থ বিশ্লেষণের মাধ্যমে মোকাবেলা করা উচিত। সাধারণত কৃষিকাজ বলতে জমিতে ফসল ফলানোকে বুঝি। কিন্তু কৃষি সম্পর্কে সীমাবদ্ধ জ্ঞানকে সংশোধন করতে হবে। কৃষিজ কাজ বলতে একই সঙ্গে চাষাবাদ, মৎস্য পালন, গবাদি পশু পালন, বনায়ন ও কৃষির সঙ্গে জড়িত বিষয়কে বোঝায়। সংবিধানের নির্দেশ মোতাবেক কৃষি বিপ্লবের উন্নয়ন সাধন করার নিমিত্তে সরকার প্রতি বছরই রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট প্রণয়নকালে কৃষির প্রতি বিশেষ নজর দিয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে, বরাদ্দকৃত অর্থের বড় অংশ জনপ্রতিনিধি ও সরকারি ব্যক্তিদের দ্বারা লুণ্ঠিত হয়। ফলে সে অর্থ কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখতে পারেনি। এ কারণেই আমাদের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লব একটি আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। দেশের কৃষিখাতকে সুরতি ও গ্রামীণ উন্নয়ন বাস্তবায়ন করতে হলে, দারিদ্র্য কৃষকদের উৎপাদন সহায়তা, ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকল্পে মূল্য সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করতে হবে, যেন কৃষকদের থেকে ফসল সংগ্রহ এবং ফসল রপ্তানি অতি দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। এছাড়াও কৃষকদের স্বনির্ভর করার ল্েয সামাজিকভাবে ঐক্য দায়িত্ব নিতে হবে। কৃষিভিত্তিক শিা প্রদান করতে হবে। কৃষির পাশাপাশি কুটির শিল্প স্থাপন ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ সাধন করা গেলে কৃষিনির্ভর জীবন থেকে বের হয়ে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব হবে। তখন সাধারণ কৃষক খাদ্যের নিশ্চয়তা ও নির্ভরতায় চিন্তামুক্ত থাকতে পারবে। অন্যদিকে কৃষকদের ব্যক্তিগতভাবে কৃষিসংক্রান্ত আধুনিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে। যাতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় হতে রা পাওয়া সহজ হয়। এ সকল সমস্যাকে দ্রুত সমাধান করা হলে গ্রামীণ উন্নয়ন সম্ভব হবে। গ্রামীন উন্নয়ন সম্ভব হলে বাংলাদেশ উন্নত দেশে রূপান্তরিত হতে সময় লাগবে না! 


আব্দুল্লাহ মাহমুদ : সম্মান (চতুর্থ বর্ষ), বাংলা বিভাগ 
সাতীরা সরকারি কলেজ 
abdullahmahmud827@gmail.com
 

You May Also Like