ঢাকায় খাঁটি সরিষার তেল

মির্জা আবু হেনা কায়সার টিপু ॥ 

এক সময়  বাঙ্গালির ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণ করত সরিষার তেল। গরুর চোখ বেঁধে গাছ ঘুরানো ঘানিতে ভাঙানো হতো সরিষা। সে সরিষার তেলই ছিল বাঙালির প্রাণ। একটা সময় ব্যাপক চাহিদা পূরণে বাণিজ্যিকভাবে জেলা শহর, থানা সদরের বাজারগুলোতে, এমনকি প্রসিদ্ধ গ্রামের বাজারগুলোতে ডিজেল চালিত ও বিদ্যুৎ চালিত সরিষার তেল আহরণকারী বড়, মাঝারি ও ছোট সাইজের মেশিনারী ঘানি ছিল পরিচিত ও চোখে পড়ার মতো। সব ঘানি আসায় গরু নামের প্রাণীটির অনেকাংশেই মুক্তি মিলেছিল- সেই চোখ বাঁধা ঘানি ঘুরানো নিষ্ঠুর ও দৃষ্টিকটু শ্রম দেওয়া থেকে। বাংলায় একটি গানই সম্ভবত আছে, মা আমায় খাটাবি কতো /চোখ বাঁধা বলদের মতো। এই বলদের সঙ্গে মানুষের সরিষা থেকে তেল বের করার খাটানো অসুন্দর ও কষ্টদায়ক দৃশ্যটার উক্তি কিন্তু মানুষেরর জীবনকেও ছুঁয়ে যেত একসময়। অধিকার বঞ্চিত মানুষের মুখে শোনা যেত, জীবনভর খইল খাইলাম আর বলদের মতো গাছ ঘুরিয়ে গেলাম। সরিষার তেল উচ্ছিষ্ট অংশই খইল, যা গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে। অমানবিক, অমানুষিক খাটতে থাকা মানবজীবনের সঙ্গে একটি পরিচিত শব্দও সেই সরিষার ঘানি টানা বলদের উদাহরণ কলুর বলদ। সরিষাই বাঙালির ভোজ্য তেলের প্রধান পরিচায়ক হলেও সঙ্গে আরও দুটি তেলবিজের সঙ্গেও ছিল বাঙালির দারুন সখ্য। সে দুটি তৈলবীজ তিল ও বাদাম। এগুলোতেও গরুর ঘানি ও যান্ত্রিক ঘানিতে ভাঙিয়ে তেল আহরণ ও রান্নার কাজে কমবেশি দৃষ্টিতে পড়ত। এই তিনটি তেলবীজের রিফাইন্ডবিহীন ঘানিতে ছেঁচে বের করা তেলই ছিল বাঙালির জন্য স্বাস্থ্যকর তেলের জোগান। এসব তেল সে সময় নিরাপদও ছিল বলা যায়। গরুর ঘানি কিংবা যান্ত্রিক ঘানি ব্যবহারে তেলের উৎপাদন পদ্ধতিটা ছিল এমন নিজেদের উৎপাদিত তেলবীজ টাকার বিনিময়ে ভাঙিয়ে তেল বের করে আনা হতো এসব ঘানি থেকে। এসব ঘানির ব্যবহারও হতো বাণিজ্যিকভাবে তেল উৎপাদন করে বাজারজাত করা। বাণিজ্যিক ঘরানার লোকদের সঙ্গে ঘানির মালিকদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘানির মালিকরাও বাণিজ্যিক তেল ব্যবহার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এসব ঘানিতে মাঝেমধ্যে স্বল্প পরিমাণে তিল ও বাদাম ছেঁচে তেল বার করতে দেখা গেলেও সরিষাই ছিল মূল আকর্ষণ। সরিষার তেলই ছিল বাজারের ভোজ্য তেলের প্রধান উপকরণ। সরিষার তেলের ব্যবহার বাঙালির রান্নাঘরে কি অসাধারণ ঘ্রাণ ছড়াতো। সে খাঁটি সরিষা তেলের জায়গাটা এক সময় দখল করে নিল বহুজাতির কোম্পানিগুলো- বিদেশ থেকে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি করে পরিশোধনের পর প্লাস্টিকের বোতলে বাজারজাত করার পর। হু-হু করে বাজার সম্প্রসারিত হয়ে গেলে পরিশোধিত সয়াবিন তেলের। অপরিশোধিত আমাদের সরিষার তেল যতটা স্বাস্থ্যকর ছিল, সে তুলনায় পরিশোধিত অস্বাস্থ্যকর সয়াবিন তেলই সানন্দে গ্রহণ করল বাঙালি। রান্নাঘর থেকে অনেকটা জাদুঘরেই চলে গেল বাঙালির প্রিয় সরিষার তেল। সে জায়গা দাপটের সঙ্গে দখল করে নিল সয়াবিন তেল। সরিষার তেল নিয়মিত রান্নার কাজে ব্যবহার চোখে পড়ে না তেমন। কিছু বিশেষ খাবার প্রস্তুত, ভর্তা ও আচারের মতো খাদ্য তৈরীতে ব্যবহার হয় সরিষার তেল। সরিষার তেলের এরূপ ব্যবহারকে মাথায় রেখে স্বনামধন্য বহুজাতির কোম্পানিগুলো তো বটেই, এছাড়া পরিচিত, কম পরিচিত বহু প্রতিষ্ঠান বাজারে বোতলজাত পরিশোধিত সরিষার তেল সরবরাহ করে যাচ্ছে, যার মান নিয়ে রয়েছে ভিন্নমত ও সন্দেহ। এবার একটু হাসির কথা বলি। পরিশোধিত বাজারজাতকৃত নামিদামি কোম্পানির তো অবশ্যই বেনামি যততত্র বিক্রয়ের জন্য পথেঘাটে সাজিয়ে রাখা সরিষার তেলের সঙ্গে একটি শব্দ আজকাল জুড়ে দেওয়া হচ্ছে, সেটি হলো খাঁটি। অথাৎ খাঁটি সরিষার তেল, সরিষার তেলে কী পরিমাণ ভেজাল আছে আর চুড়ান্ত স্বীকৃতিই হচ্ছে এ শব্দটি। খাঁটি শব্দটি ব্যবহার করতেই হচ্ছে কোম্পানিগুলোকে। সেদিন ঢাকার এক অংশে ভ্রাম্যমাণ ভ্যানরিকশায় নজরে এলো একটি দৃশ্য। সে বিক্রেতা সরিষার তেল-মধু এসব বিক্রি করছেন ভ্যানরিকশায় করে। নামিদামি বহুজাতির কোনো প্রতিষ্ঠানের পণ্য নয়। সে-ই জানে কোথা থেকে এনেছে সে, তবে প্লাষ্টিক সাইনে তার যে বিজ্ঞাপনের পলিসি তা একধান সরেস। লেখা সত্যিকারের সরিষার তেল। আমি কৌতুহলবশত বললাম, কাকা, মিথ্যাকারের কোনটা? তিনি হেসে বললেন, বাবা সবই মিথ্যা। চাচা বোঝাতে চাইলেন তারটাই খাঁটি, হা-হা-হা। রাজধানী ঢাকায় একটি দৃশ্য আমার দৃষ্টিতে পড়েছে। নিশ্চয়ই নগরবাসীর দৃষ্টি এড়ায়নি। সেটি হচ্ছে ঢাকার নাগরিকদের মাঝে খাঁটি সরিষার তেল সরবরাহের কৌশল। অপরিশোধিত সেই ঘানিতে ছেচে বের করা সরিষার তেল মহানগরের অলিগলিতে নিয়মিতই নজরে আসছে এলাকা ভেদে। ছোট পিকআপ তথ্য ট্রাক্টরে ডিজেল চালিত যান্ত্রিক ঘানি বসিয়ে ভ্রাম্যমাণ এই ঘানি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিছু মানুষ। ক্রেতার সামনেই সরিষা ছেঁচে বের হচ্ছে খাঁটি সরিষার তেল। বিক্রি করছে প্রতি লিটার ২০০ টাকায়। বিক্রিও মন্দ নয়। এই ভ্রাম্যমাণ সরিষার তেলের যান্ত্রিক ঘানি যেন সরিষার তেলের সেই হারিয়ে যাওয়া সুদিনকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে।

You May Also Like