ফ্যাটি লিভার ডিজিজে খাদ্যাভ্যাস

ফ্যাটি লিভার ডিজিজে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার মূলমন্ত্রই হলো খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ। খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো ওজন হ্রাস। রিসার্চ করে দেখা গেছে, ৩ থেকে ৫ শতাংশ ওজন কমালে ফ্যাটি লিভার থেকে সৃষ্ট ফাইব্রসিস ভালো হয়ে আসে এবং ১০ শতাংশ ওজন কমালে লিভার প্রদাহ হ্রাস পায়। কিন্তু ওজন কমাতে হলে খাদ্যাভ্যাস কীভাবে পরিবর্তন করতে হবে। শুধু দৈনিক গৃহীত ক্যালরির পরিমাণ কমালেই হবে না, সঙ্গে খাদ্য দ্রব্যের ধরনেও পরিবর্তন আনতে হবে। আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা এ সংক্রান্ত কিছু দিক নির্দেশনা পাওয়ার চেষ্টা করব। 
ডায়েট ও ওজন হ্রাসের মূলনীতি : 
ফ্যাটি লিভার এ খাদ্যাভ্যাস তথা ডায়েট ও ওজন হ্রাসের মূলনীতিগুলো হলো 
১. দৈনিক খাদ্যের সর্বমোট ক্যালরির পরিমাণ হ্রাস। 
২. তড়িঘড়ি না করে ধীরে ধীরে ওজন কমানো। 
৩. অধিক ফাইবার তথা আঁশযুক্ত শর্করা, শাক-সবজি, দানাদান খাদ্য এবং অল্প পরিমাণে আমিষ ও তেল জাতীয় খাবার গ্রহণ। 
৪. সম্পৃক্ত তেল তথা স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিবর্তে ওমেগা-৩ বা ওমেগা-৯ জাতীয় অসম্পৃক্ত তেল তথা পলি-বা মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণ। 
৫. ফ্রক্টোজ সিরাপ দিয়ে তৈরি খাদ্য (সফট ড্রিংক) পরিহার বা হ্রাস করা। 
৬. প্যাকেটজাত প্রস্তুতকৃত খাবার এবং ফাস্টফুড পরিহার করা। 
দৈনিক খাদ্যের সর্বমোট ক্যালরির পরিমাণ হ্রাস করা : 
আমাদের শারীরিক সুস্থতা এবং কর্মক্ষমতার জন্য দৈনন্দিন যে পরিমাণ ক্যালরি গ্রহণ প্রয়োজন তা নির্ভর করে আমাদের বয়স, উচ্চতা, লিঙ্গ, ওজন ও শারীরিক কার্যক্রমের পরিমাণের ওপর। যারা অফিসে বসে ডেস্ক জব করেন আর যারা কৃষি কাজ করেন তাদের দৈনন্দিন শক্তির প্রয়োজনীয়তা এক নয়। তবে আমাদের কাজের ধরন যা হোক না কেন, ফ্যাটি লিভার থাকলে চিকিৎসার শর্ত ওজন হ্রাস করা। সে উদ্দেশ্যে আমাদের দৈনিক গৃহীত খাদ্যের পরিমাণ কমাতে হবে। কতটুকু কমাতে হবে তা নির্ভর করে আমাদের বিএমআই (বডি ম্যাস ইনডেক্স) এবং ওজন কমানোর নির্দেশিত হারের ওপর। সাধারণত কারও বিএমআই ওভারওয়েট (২৫ থেকে ৩০ কেজি/মিটার স্কয়ার) এবং ওবিজি (৩০ কেজি/মিটার স্কয়ারের বেশি) হয় তাদেরকে ওজন কমানোর উপদেশ দেওয়া হয়। তবে নরমাল বিএমআই (১৮ থেকে ২৪.৯ কেজি/মিটার স্কয়ার) এর ফ্যাটি লিভার রোগীদের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে ওজন কমালে উপকার পাওয়া যায়। ক্যালরি হ্রাসের পরিমাণ হতে হবে হিসাবকৃত ক্যালরি হতে ৫০০-১০০০ ক্যালরি হ্রাস। তবে লো-ক্যালরি ডায়েট খেতে গিয়ে যেন প্রতিদিন ৪০০ কিলোক্যালরির নিচে নেমে না আসে সেটা লক্ষ্য রাখতে হবে। কেননা এর চেয়ে নিচে নেমে আসলে হিতে বিপরীত হতে লিভারের প্রদাহ আরো বেড়ে যেতে পারে।  
তড়িঘড়ি না করে ধীরে ধীরে 
ওজন কমানো 
আমরা আগেই জেনেছি, বর্তমান শারীরিক ওজনের ৩ থেকে ৫ শতাংশ ওজন কমালে ফ্যাটি লিভার থেকে সৃষ্ট ফাইব্রসিস ভালো হয়ে যায় এবং ১০ শতাংশ ওজন কমালে লিভার প্রদাহ হ্রাস পায়। তবে ফ্যাটি লিভার ডিজিজে ওজন কমাতে হয় ধীরে ধীরে। মূল লক্ষ্য হলো প্রতি সপ্তাহে আধা কেজি থেকে এক কেজি ওজন কমানো। সপ্তাহে ওজন কমানোর হার এর চেয়ে বেশি হলে লিভারের প্রদাহ উল্টো বেড়ে যায়। 
আঁশযুক্ত শর্করা ও তেল জাতীয় খাবার শর্করা, শাক সবজি ও 
দানাদার খাবার : 
মানুষের দৈনিক প্রয়োজনীয় ক্যালরির ৪০ থেকে ৫০শতাংশ হতে হবে শর্করা। শর্করা আঁশযুক্ত হলে ভালো হয়। আঁশযুক্ত খাবারের মধ্যে রয়েছে আটা, বাদামি ভাত, ওটমিল এবং বার্লি। ওটমিল এবং বার্লি জাতীয় খাবারে থাকে দ্রবনীয় আঁশ। যা রক্তের কোলেস্টরেল কমায়, গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। অন্যদিকে বাদামি ভাত ও আটায় থাকে অদ্রবণীয় আঁশ। যা পরিপাকনালির নড়াচড়া বাড়ায়, ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। এছাড়াও আঁশ জাতীয় খাবার হলোসবুজ শাক সবজি, শজনে, কলার মোচা, ঢ্যাঁড়স, ডাঁটা, মটর, শিম, গাজর বাঁধা কপি, ফুলকপি ওলকপি, পটোল, কচু, বেগুন, কাঁচামরিচে থাকে প্রচুর আঁশ। দানাদার খাবারের মধ্যে রয়েছে-বরবটি, মটরশুঁটি, ডাল ও ছোলা এবং ফলের মধ্যে রয়েছে : আতা, পাকা পেঁপে,স্ট্রবেরি, কলা, আমড়া ও বেল প্রভৃতিতে তুলনামূলক বেশি আঁশ পাওয়া যায়। 
আমিষ জাতীয় খাদ্য : 
দৈনিক খাবারের ২০ শতাংশ হতে হবে প্রোটিন তথা আমিষ। আমাদের দেশে আমিষ জাতীয় খাবারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খাওয়া হয় গরু, খাসি, মুরগির মাংস, মাছ ও ডিম। এর বাইরে ডাল, ছোলা, প্রভৃতিতেও আমিষ থাকে, তবে তা পরিমাণে কম। ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত রোগীর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত আমিষ হলো মাছ। এরই বাইরে মুরগির মাংস এবং ডিমের সাদা অংশও খাওয়া যেতে পারে। গরু ও খাসির মাংস খেতে হবে চর্বি ছাড়িয়ে। তবে সামর্থ্যবানদের একটি উপকারী ডায়েট হলো অধিক আমিষ যুক্ত ডায়েট। তবে অতিরিক্ত আমিষ খাওয়াও ভালো নয়। 
চর্বি ও তেলজাতীয় খাবার : 
চর্বি ও তেল জাতীয় দৈনিক খাবারের পরিমাণ হতে হবে খাদ্য চাহিদার ৩০ শতাংশের কম। আমরা যে চর্বি বা তেল জাতীয় খাবার খাই তা মূলত দুই ধরনের। সম্পৃক্ত বা স্যাচুরেটেড চর্বি ও অসম্পৃক্ত বা আনস্যাচুরেটেড চর্বি। এর মধ্যে শরীরের জন্য উপকারী হচ্ছে অসম্পৃক্ত চর্বি। সম্পৃক্ত চর্বি থাকে মাছ ও মাংসের মধ্যে। তবে এর মধ্যে ব্যতিক্রম হচ্ছে সামুদ্রিক মাছ। সামুদ্রিক মাছের তেলে থাকে এক বিশেষ ধরনের অসম্পৃক্ত চর্বি, যাকে বলে ওমেগা-৩ ওয়েল। অসম্পৃক্ত চর্বির মূল উৎস হলো উদ্ভিদজাত তেল। যেমন-সরিষার তেল, সয়াবিন তেল কর্নওয়েল, তিলের তেল, তিসির তেল, জলপাই তেল বা অলিভ অয়েল ইত্যাদি। এর মধ্যে সবচেয়ে উপকারী হলো অলিভ অয়েল। এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলে একই সঙ্গে অসম্পৃক্ত চর্বি এবং এন্টি-অক্সিডেন্ট পদার্থ থাকে। যা শরীরের চর্বির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে খুবই উপকারী। যাদের সামর্থ্য আছে তারা যদি আমিষের মতো অধিক অসম্পৃক্ত তেল যেমন-অলিভ অয়েল, তিসির তেল, সরিষার তেল গ্রহণ করে যাতে প্রতিদিনের ৪০ শতাংশ ক্যালরির প্রয়োজন মেটে তাহলে তাও শরীরের জন্য উপকারী। সামুদ্রিক মাছের তেল, সবুজ শাক সবজি, সরিষার তেল ও তিসির তেলও শরীরের জন্য উপকারী। অসম্পৃক্ত তেল শরীরের জন্য উপকারী এবং সম্পৃক্ত তেল অপকারী। অসম্পৃক্ত তেলের মধ্যে ওমেগা-৩ এবং ওমেগা-৯ অয়েলের ভালো উৎস হলো যথাক্রমে সামৃদ্রিক মাছের তেল, জলপাই তেল ও অলিভ অয়েল। 
ফ্রক্টোজ খাবার ও সফট ড্রিংক পরিহার 
বর্তমানে ফ্রক্টোজ সিরাপ দিয়ে তৈরি যেসব খাবার পাওয়া যায় তার মধ্যে রয়েছে প্যাকেটজাত মিষ্টি খাবার, জ্যাম, জেলি ও সফট ড্রিংকস যেমন কোলা। এসব খাবার লিভারের জন্য খুবই ক্ষতিকর। কারণ এগুলো রক্তে ও লিভারের ফ্যাটে পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এ জন্য এ জাতীয় খাবার সম্পূর্ণ পরিহার করা উচিত। 
প্যাকেটজাত খাবার ও ফাস্টফুড 
প্যাকেটজাত প্রস্তুতকৃত খাবারে ফ্রক্টোজ সিরাপ ও টেস্টিং সল্ট ব্যবহার করা হয়। উভয়ই শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এ খাবারগুলো রক্তে চর্বি বাড়ায় ও লিভারের ফ্যাট জমা করে। রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণও অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যায়। এভাবেই ফাস্টফুড বা ফ্রাই করা ভাজা খাবার শরীরের জন্য ক্ষতিকর। কারণ ভাজার ফলে অসম্পৃক্ত তেলও সম্পৃক্ত তেলে পরিণত হয়। যা রক্তে ও লিভারে চর্বির পরিমাণ বাড়ায়। ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত রোগীর ওজন, উচ্চতা, বয়স ও লিঙ্গ অনুযায়ী হিসেব করে দৈনন্দিন ক্যালরির চাহিদা পাওয়া যায় তার থেকে ২০০ বা ৩০০ ক্যালরি খাবার কম খেতে হবে। রোগীর বডি ম্যাস ইনডেক্স ২৫-এর ওপর হলে প্রতিদিন ৫০০-১০০০ ক্যালরি কমিয়ে খেতে হবে। কমানোর পর সর্বমোট হিসাবকৃত ক্যালরির যথাক্রমে ৪০-৪৫ শতাংশ, ২০ শতাংশ এবং ৩০% হতে হবে শর্করা, আমিষ এবং চর্বি। তার মধ্যে শর্করা আঁশযুক্ত এবং চর্বি অসম্পৃক্ত হওয়া দরকার। তবে শুধু খাবার নিয়ন্ত্রণ করে ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসা প্রায় অসম্ভব। ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসার অন্যতম শর্ত হচ্ছে শরীরচর্চা। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটলেও ফ্যাটি লিভার জটিলতা অনেক কমে আসে। 
 

You May Also Like