বাঘাবাড়ী মিল্কভিটার জমি ভূমিদস্যুদের দখলে : গো-চারণ ভূমি সঙ্কুচিত

  • Posted on 30-01-2020 18:08:04
  • About

আমিষ ডেস্ক ॥ 

সরকারি দুগ্ধ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী সমবায়ী প্রতিষ্ঠান বাঘাবাড়ী মিল্কভিটার গোচারণ ভূূূমি বাথানের প্রায় ৫৫০ একর (এক হাজার ৬৫০ বিঘা) জমি বেদখল হয়ে গেছে। মিল্কভিটার বাথান কমিটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যথাযথ তদারকির অভাবে স্থানীয় ভূূূমিদস্যুরা এই জমি নিজেদের নামে জাল দলিল ও পত্তনির মাধ্যমে জোরপূর্বক ভোগদখল করছে। এতে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে উত্তরের বৃহত্তম গোচারণ ভূূূমি বাথান। অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও শাহজাদপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বাদি হয়ে আদালতে পৃথক ছয়টি মামলা দায়ের করেছেন। মিল্কভিটা সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৩ সালে প্রেসিডেন্টের অর্ডিনেন্স বলে পাবনা জেলার সাঁথিয়া, ফরিদপুর, ভূূাঙ্গুড়া, চাটমোহর এবং সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার বাথান হিসেবে পরিচিত সমর্পিত খাস ও অর্পিত প্রায় এক হাজার ৮০০ একর জমি সরকারি দুগ্ধ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী সমবায়ী প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটার নামে এককালীন লিজ প্রদান করা হয়। সেই থেকে দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতিগুলো মিল্কভিটা থেকে বার্ষিক লিজ নিয়ে রাউতরা বাথানের জমি গোচারণ ভূূূমি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। কিছু কিছু সমিতির স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তৎসময়ে মিল্কভিটা ও ভূূূমি অফিসে কর্মরত কিছু কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে জমির ভূয়া কাগজপত্র তৈরি করে জোরপূর্বক ভোগদখল করে আসছে। আবার অনেকেই বাথানের জমি গোচারণ ভূূমি হিসেবে লিজ নিয়ে ঘাস চাষ না করে ইরিবোরো ধানের আবাদ করছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, স্বাধীনতার আগে চলনবিল অঞ্চলের সাঁথিয়া, ফরিদপুর, ভূূাঙ্গুড়া, চাটমোহর, উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুর উপজেলায় প্রায় পাঁচ হাজার একর জমি গোচারণ ভূমি ছিল। জাল দলিল ও ভূয়া পত্তনি নিয়ে এলাকার একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি গোচারণ ভূমি জোড়পূর্বক নিজেদের দখলে নিয়েছে। শাহজাদপুর উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বাথান এলাকায় গোচারণ ভূমির পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ৪০০ একর। এরমধ্যে ফরিদপুর উপজেলায় প্রায় ১০০ একর খাস, শাহজাদপুর উপজেলায় সমর্পিত খাস ৭১২ দশমিক ৬৮ একর ও অর্পিত ৫৭৯ দশমিক ১৬ একর গোচারণ ভূমি রয়েছে। মিল্কভিটার ম্যানেজার সমিতি জানান, বর্তমানে মাত্র ৮৫০ একর জমি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অবশিষ্ট ৫৫০ একর ( এক হাজার ৬৫০ বিঘা) জমি ভূয়া দলিল ও পত্তনির মাধ্যমে স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি বাথানের জমি দখল করে নিয়েছে। সরকারি এই জমি অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে উদ্ধারের জন্য আদালতে ছয়টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। অবৈধ দখলের কবলে পড়ে উত্তরের বৃহত্তম গোচারণ ভূমি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের রাউতরা বাথান এলাকা ক্রমে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। এই বাথান এলাকার ইতিহাস খ্যাত বুড়িপোতাজিয়া কুঠিরভিটা, রাউতগাড়ি, রামকান্তপুর ও হান্নি মৌজায় বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের যৌথ প্রয়াস ও অর্থায়নে ১০০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্ব কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে দেশের ৩৮তম পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় ‘রবীন্দ্র বিশ^বিদ্যালয় বাংলাদেশ’। সরকারি দুগ্ধ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী সমবায়ী প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটার পরিচালনা পরিষদের সাবেক পরিচালক নজরুল ইসলাম অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে গোচরণ ভূমি বাথানের জমি উদ্ধারের জন্য সরকারের কাছে জোড় দাবি জানিয়েছেন। মিল্কভিটাভুক্ত কয়েকটি প্রাথমিক দুগ্ধ সমবায় সমিতির নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্বাধীনতার পর এই বিস্তীর্ণ গোচারণ ভূমিকে (বাথান) কেন্দ্র করে পাবনা-সিরাজগঞ্জের দুগ্ধ অঞ্চলের বাঘাবাড়ীতে বড়াল নদী পাড়ে স্থাপন করা হয় সরকারি দুগ্ধ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী সমবায়ী প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটা। মিল্কভিটার বাঘাবাড়ী ‘ক’ ও ‘খ’ অঞ্চলে পাঁচ শতাধিক প্রাথমিক দুগ্ধ সমবায় সমিতি রয়েছে। সমিতিতে গো-খামারের সংখ্যা রয়েছে প্রায় ১৫ সহস্রাধিক। পাবনার এবং সিরাজগঞ্জের বাথানের জমি মিল্কভিটার নিবন্ধিত দুগ্ধ সমবায় সমিতি গোচারণ ভূূমি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। বছরের ৯ মাস এই বাথানগুলোতে লক্ষাধিক গরু বিচরণ করে থাকে। তারা অভিযোগ করেন, বাথান কমিটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যথাযথ তদারকির অভাবে মিল্কভিটার শত শত একর জমি বেদখল হয়ে যাচ্ছে। ভূয়া দলিল ও পত্তনির মাধ্যমে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে মিল্কভিটার জমি। এই অবৈধ দখলদারদের কবলে পড়ে উত্তরের বৃহত্তম গোচারণ ভূমি সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। আবার কিছু কিছু সমিতির কর্মকর্তারা জমি লিজ নিয়ে ঘাসের পরিবর্তে ধান আবাদ করেও থাকে। এতে বাথানে কাঁচা ঘাসের সঙ্কট দেখা দেয়। প্রাথমিক দুগ্ধ সমবায় সমিতির সদস্যরা বাথানের বেদখল হয়ে যাওয়া জমি দখলমুক্ত এবং ধান আবাদ বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন। শাহজাদপুর উপজেলা ভূূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ১ আগস্ট কিছু দখলদার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে জমির মালিকানা দাবি করে। তারা কোনো দুগ্ধ সমিতিকে জমি লিজ না দেয়ার জন্য অনুরোধ করে। ফলে বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়। এরপর ভূয়া আর এস রেকর্ড করার অভিযোগে ওই সব দখলদারদের বিবাদি করে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও শাহজাদপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বাদি হয়ে আদালতে পৃথক ছয়টি মামলা দায়ের করেন। শাহজাদপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। প্রথম মামলায় পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়নের পাথাইলহাট গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা শামসুল ইসলাম ওরফে নান্নু মিয়া তার স্ত্রী হোসনে আরা বেগম, ছেলে মো: আবুল হাসনাত, দুই বোন রেহানা আক্তার ও তাহমিনা বেগমসহ মিল্কভিটার বাঘাবাড়ী কারখানার ব্যবস্থাপক (সমিতি), বাথান কমিটির সদস্য সচিবকে বিবাদি করা হয়েছে। ওই একই পরিবারের পাঁচ সদস্যের নামে ৮০ দশমিক ১০ বিঘা জমি (২৬ দশমিক ৭৬ একর) আর এস রেকর্ড করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ব্যাপারে শামসুল ইসলাম ওরফে নানু মিয়া জানিয়েছেন, এই জমিগুলো আমারা রেকর্ড করিনি। ওই জমি আমাদের জমির পাশে হওয়ায় তৎকালীন সার্ভের সময় সংশ্লিষ্টরা আমাদের নামে রেকর্ড করে থাকতে পারে। বিষয়টি আমাদের জানা নেই। শাহজাদপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি অফিসের একটি সূত্র জাল দলিল করে জমি জোরপূর্বক ভোগদখলের ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছে, এই রেকর্ড ভূূয়া এবং অবৈধ। যে জমি খাস খতিয়ানভুক্ত তা কখনো ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড করা সুযোগ নেই। কেউ রেকর্ড করলেও এটি কার্যকর হবে না।

You May Also Like