কুমারখালীর দুই-তৃতীয়াংশ পোলট্রি খামার বন্ধ

কুষ্টিয়া থেকে সংবাদদাতা ॥ 

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ৩৫টি ব্রয়লার মুরগির খামার কোনো রকমে টিকে থাকলেও নানা সমস্যায় ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ৭০টি খামার। বিদ্যুৎ, ওষুধ ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি লোকসানে মুরগি বিক্রি এবং বার্ড ফ্লু আতঙ্কে কুমারখালীর পোলট্রি শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। খামার মালিকরা ব্যবসা বন্ধ করে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। শত শত শ্রমিক হয়ে পড়েছেন বেকার। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কুমারখালীর বিভিন্ন এলাকায় ছোট বড় মিলে ১০৫টি পোলট্রি খামারের মধ্যে ৭০টি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এবং ৩৫টি কোনো মতে টিকে রয়েছে। চালু থাকা খামারগুলোও নিয়মিত বাচ্চা তুলছে না। ফলে মাঝে মধ্যেই বাজারে ব্রয়লার মুরগির সঙ্কট দেখা দিচ্ছে। পাশর্^বর্তী পাবনা ও ঝিনাইদহ জেলা থেকে মুরগি ও ডিম আমদানি করতে হচ্ছে। কুমারখালী উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস ও পোলট্রি খামার মালিক সমিতি সূত্রে জানা যায়, হাঁস-মুরগির খাদ্য ও বিদ্যুতের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, মুরগি ও ডিমের দাম না পাওয়া, পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের অযৌক্তিক শর্ত ও বার্ড ফ্লু আতঙ্ক কুমারখালীর পোলট্রি শিল্পের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৩-৪ বছর আগেও ব্রয়লারের যেই খাদ্য কোম্পানি ভেদে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা বস্তা পাওয়া যেত এখন সেই খাদ্যের দাম ২ হাজার ৪০০ টাকায় পৌঁছেছে। কয়েকজন খামার মালিক জানান, খাদ্যের দাম বিভিন্ন কোম্পানি সিন্ডিকেট করে বাড়িয়ে দেয়। তারা মুরগির বাচ্চা অনেক সময় মূল্যছাড়ে সরবরাহ করে খাদ্যের ওপর দিয়ে ছাড়ের টাকা তুলে নেয়। সে সময় খামারিদের কিছুই করার থাকে না। উপজেলার সান্দিয়াড়ার সবচেয়ে বড় খামার মালিক জাহাঙ্গীর হোসেন জুয়েল বলেন, খাদ্য, বিদ্যুৎ, ওষুধের দাম দিনকে দিন বাড়লেও ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দাম বাড়ে না। ফলে দিন দিন লোকসানের কারণে খামারগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। উপজেলার কেশবপুরের খামারি সোলেমান জানান, বর্তমানে খামার মালিকরা প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি পাইকারিভাবে ৮০-৮৫ টাকার বেশি দামে বিক্রি করতে পারছেন না। সে ক্ষেত্রে ওষুধ বেশি ব্যবহার হলে লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে। তাই তিনি এখন বাধ্য হয়েই নিজের খামার বন্ধ করে দিয়ে খুচরা বিক্রেতা হয়েছেন। খুচরা বাজারে ১০০-১১০ টাকা কেজি দরে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে। এ দিকে লেয়ার ও সোনালি মুরগির চাষ নেই বললেই চলে। শহরতলির বাটিকামারার জনপ্রিয় খামার মডার্ন পোলট্রি কয়েক বছর আগেই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। অন্য দিকে অনেক ফিড ও ওষুধের দোকানও বন্ধ হয়ে গেছে। কুমারখালী উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ৩৭টি লেয়ার খামারের মধ্যে বর্তমানে টিমটিম করে উৎপাদনে রয়েছে মাত্র ১১টি খামার। এ দিকে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন করে শর্ত দিয়েছে। এই শর্তে তিন শ’র বেশি মুরগি পালন করলে শিল্প-কারখানার হারে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করার কথা বলা হয়েছে। এতে খামার মালিকদের লোকসানের পাল্লা আরো ভারী হলো। এই নতুন শর্তের ফলে এ শিল্পে অর্থ বিনিয়োগ করতে মালিক পক্ষ উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। সব মিলিয়ে খামারগুলো বন্ধ হওয়ার কারণে প্রাণিজ আমিষের যেমন প্রকট সমস্যা দেখা দিয়েছে তেমনি বাড়ছে বেকারত্ব। অনেকে ধারদেনা কিংবা ব্যাংক ঋণ নিয়ে খামার করে অব্যাহত লোকসানের কারণে এখন সর্বস্বান্ত। শেড বিক্রি করেও তাদের ধারদেনা শোধ হচ্ছে না। কেউ কেউ বাঁচার তাগিদে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। উপজেলার যদুবয়রা গ্রামের পারভেজ বাংগাল, এলংগী গ্রামের নজরুল ইসলাম, জোতমোড়ার ইমরান ফারাজী প্রমুখ খামারি লোকসান দিতে দিতে এখন সর্বস্বান্ত। তারা ২-৩ বছর আগেই খামার বন্ধ করে অন্য পেশায় চলে গেছেন। কোনো মতে টিকে থাকা খামার মালিকরা জানান, ফিড কোম্পানির সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়া দরকার। তারা বলেন, জরুরি ভিত্তিতে সরকারিভাবে বিনা সুদে বিনিয়োগের ব্যবস্থা না করা গেলে অচিরেই সচল খামারগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে। বেকার হয়ে পড়বেন শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই। 

You May Also Like